১৫বছর পর পশ্চিমবঙ্গে আবারও শাসক পরিবর্তন হলো, তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর একটা দল ক্ষমতায় এলো৷ নতুন সরকার আশায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, প্রাথমিক আশঙ্কার সেই মেঘ আপাতত কেটে গেছে৷ পূর্বতন সরকারের বেশকিছু সামাজিক প্রকল্প সেই মেঘ আপাতত কেটে গেছে৷ পূর্বতন সরকারের বেশ কিছু সামাজিক প্রকল্প ঘিরে মানুষের জন্যে একটা আশঙ্কা ছিল--- এই সব প্রকল্প চালু রাখবে তো৷ আশাঙ্কার কারণ বর্তমান সরকার বিরোধী দলে থাকার সময় এই সামাজিক প্রকল্পগুলিকে ভিক্ষে বলে কটাক্ষ করতো৷ আপাতত সাধারণ মানুষের স্বস্তি এই সরকার সামাজিক প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের চটিতেই পা গলিয়েছেন৷ স্বাধীনতার ৭৮ বছরে ক্ষমতার দলবদল হয়৷ কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না৷ কারণ ভারতবর্ষ পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র৷ তাই স্বাধীনতার সব মুখ পুঁজিবাদীরাই ভোগ করে৷ রাজনৈতিক দলগুলি তাদের কৃপার দানে চলছে৷ তাই তারাও ক্ষমতায় এসে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা পুঁজিবাদীদের স্বার্থরক্ষায় বেশী নজর দেয়৷ স্বাধীনতার অনেক আগেই সুভাষচন্দ্র এই আশঙ্কা করেছিলেন৷ তাই তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কথাও বলেছিলেন৷ তাই পুঁজিবাদীদের পৈতৃকভূমি (!) ভারতবর্ষে তাঁর স্থান হয়নি৷ তাই ভারতবর্ষ ইংরেজদের কবল থেকে ‘‘স্বাধীনতা পেলেও প্রকৃত স্বাধীনতা আজ পর্যন্ত সাধারণ ভারতবাসী পায়নি৷ কারণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেলেই তবে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফলপ্রসূ হয়৷ কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে৷ সব সরকারকেই পর্দার অন্তরালে রেখে পুঁজিপতিরাই শাসন চালনা করছে৷ যদিও পুঁজিবাদকে ধবংস করার জন্যে বঙ্গে কমিউনিজম এসেছিল ও দীর্ঘ তিন দশক রাজত্ব করেছিল তবুও সেটাও ব্যর্থ হল আসলে এটাও হচ্ছে পুঁজিবাদ৷ পুঁজিবাদ হচ্ছে দু’ধরণের, একটি হচ্ছে ব্যষ্টি পুঁজিবাদ ও আরেকটি হল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ৷ রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ সরকারের দ্বারাই পরিচালিত হয় সুতরাং সেই সরকার যার প্রতি দয়াবান হয় তাকেই দেখে বাকীদের নয়৷ এই ভ্রান্ত দর্শন কমিউনিজমের জন্য বঙ্গে অনেক ক্ষতি হয়েছে৷ কেবল বঙ্গে নয় সমগ্র বিশ্বে এই দর্শন ব্যর্থ বলেই তা আজ নিশ্চিহ্ণ হতে বসেছে৷
মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে দেশের বেশীরভাগ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে আছে বলেই দারিদ্র দেখা দিয়েছে আর সেজন্য কমিউনিষ্টরা চেয়েছিল সমস্ত কিছু নিজেদের দখলে আনতে ও তারা করেছিলও৷ সরকারের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে, তারা যাদের ওপর বরদহস্ত হয় তারাই টাকার কুমির হয়ে যায়৷ কমিউনিষ্টদের জমানায় রাজ্যের প্রায় ৮০০০০ এর উপর কল কারখানা বন্ধ হয়েছে৷ কেবল এটাই না, এই কমিউনিষ্টদের রাজত্বকালে কত মানুষ অত্যাচারিত, শোষিত লাঞ্ছিত হয়েছিল, মানুষ খুন হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই৷ তাই নির্যাতিত মানুষেরা পরিবর্তন চেয়েছিল বলেই বঙ্গের জনগণ মমতা ব্যানার্জীকে সরকারের আসনে বসিয়েছিল ও নতুন স্বপ্ণ দেখেছিল৷ তারা ভেবেছিল এবার সত্যি পরিবর্তন হবে,মানুষ এবার মানুষের মত বাঁচতে পারবে কিন্তু তারাও মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ৷ বর্তমানে কেন্দ্রে মোদি সরকারের কাজকর্মে ও বিভিন্ন পদক্ষেপে একের পর এক বিতর্ক হচ্ছে৷ সমালোচনা হচ্ছে৷ তিনিও যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেগুলো পালন করেননি ও আরো দশ বছর থাকলেও সত্যিকারের পরিবর্তন আসবে না অর্থাৎ নেতাজীর যে স্বপ্ণ ছিল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা তা আসবে না বা আসার কোন পথও নেই৷ তবু রাজ্যে এমন ডবল ইঞ্জিন সরকার৷
এযাবৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজ্য বা দেশের কোন লাভ হয়নি৷ তাই মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার প্রণীত প্রাউট দর্শনের রূপায়নের মাধ্যমেই আসবে প্রকৃত পরিবর্তন৷
প্রাউটের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতি হবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রয়োগভৌমিক বিজ্ঞান৷ দুঃখের বিষয় কর্পোরেট জগতের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদরা অর্থনীতির এই বিজ্ঞানকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন৷ দিতে বাধ্যই হয়েছেন ক্ষমতাবানদের চাপে পড়ে৷ ধুল্যবলুণ্ঠিত, পদদলিত, অবহেলিত হতদরিদ্র মানুষের উন্নয়নের চিন্তা তাদের মাথায় আসেনি৷ কেন্দ্রিত অর্থনীতি কর্পোরেট জগতের লুণ্ঠন ও সাধারণ মানুষকে শোষণের পথ প্রশস্ত করেছে৷ তাই স্বাধীনতার এতগুলো বছর পার করেও গরীব মানুষগুলো উন্নয়নের মুখ দেখতে পায়নি৷ এর জন্যে দায়ী শুধু অর্থনীতিবিদ্রা নয়, ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতারাও এর দায় অস্বীকার করতে পারবে না৷ প্রাউট-প্রবক্তার ভাষায়---আজ অর্থনীতি বস্তাপচা তত্ত্বকথার কচ্কচানি ছাড়া আর কিছুই নয়৷ একে অধিকতর বাস্তবমুখী করতে হবে৷
আজ পর্যন্ত দেশের কি সরকার কি অর্থনীতিবিদ সেই বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পথে পা বাড়াননি৷ অর্থনীতিবিদ্রা অবশ্য বাস্তব বলতে যদি পুঁজিবাদের স্বার্থরক্ষা করাটই বোঝেন তবে তারা ১০০ ভাগ সফল৷ আজ পুঁজিবাদী শোষক তার শোষণের জাল সমাজের সর্বস্তরে বিছিয়ে দিয়েছে৷ মানুষের অস্তিত্বকে চরম বিপর্যয়ের সীমায় নিয়ে এসেছে৷ প্রাউট-প্রবক্তার ভাষায়---‘আজ সমগ্র মানব সমাজ বৈশ্য শোষণের নিষ্পেষণে ওষ্টাগত প্রাণ৷
মানুষকে বৈশ্য শোষণের হাত থেকে মুক্তি দিতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন৷ এর খোল-নলচে বদলে এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রয়োজন যেখানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিপতির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা গড়বে সমষ্টির কল্যাণের স্বার্থে৷ প্রাউটের দৃষ্টিকোণ থেকে এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বহিরাগতের কোনও ভূমিকা থাকবে না৷ কোন এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনায় বহিরাগত নাক গলালে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ব্যাহত হবেই৷ ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সবথেকে বড় ত্রুটি এটাই৷ রাজধনীর ঠাণ্ডা ঘরে বসে যাঁরা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রচনা করেন ভারতবর্ষের গ্রামের সঙ্গে তাঁদের নাড়ীর যোগ নেই৷ অর্থনীতির জটিল তত্বে তাঁদের যতই পাণ্ডিত্য থাক দেশের ভূগোল, ইতিহাস, জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোন পরিচয় নেই৷ কর্পোরেট ভারতের অঙ্গুলী হেলনে তাঁরা অর্থ পরিকল্পনা রচনা করেন৷ সেই পরিকল্পনায় গ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করার বাগাড়ম্বর থাকলেও বাস্তবের ছোঁয়া লেশমাত্র থাকে না৷ দরিদ্র জনগণ বোঝেই না অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কী জিনিস৷
প্রাউটের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রাথমিক লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবন ধারণের নূন্যতম প্রয়োজন অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, আবাস, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চিততা দেওয়া৷ এই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার পরই উদ্বৃত্ত সম্পদকে সার্বিক কল্যাণের কথা ভেবে কাজে লাগাতে হবে৷ প্রাউটের পরিকল্পনা শুরু হবে ব্লক স্তর থেকে৷
একসময় যে জনপদ সমৃদ্ধির উচ্চশিখরে অবস্থান করত পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক ভারসাম্য হারিয়ে সেই জনপদই শ্রীহীন সম্পদহীন হয়ে পড়ে৷ প্রাউট-প্রবক্তার দৃষ্টিতে জনপদগুলির শ্রীহীন হওয়ার কারণ হ’ল যে নদীকে কেন্দ্র করে জনপদ গড়ে ওঠে সেই নদী মরে যাওয়া বা সরে যাওয়া, দ্বিতীয় কারণ হ’ল গ্রাম থেকে শিল্প সরে যাওয়া বা নতুন শিল্প গড়ে না ওঠা, তৃতীয় কারণ শিক্ষাগত ত্রুটি অর্থাৎ ত্রুটিপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থা৷ এইসব কারণেই গ্রাম্যজীবনের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে৷ বলা যেতে পারে বৈশ্য শোষকরা তাদের স্বার্থে গ্রাম্য জীবনের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছে৷
একটি অঞ্চলে বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হলে কৃষিকে যেমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে শিল্পকেও তেমনি কৃষির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে হবে৷ এখন কৃষি ও শিল্পের সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রাউট দেখিয়েছে কীভাবে ১০০ ভাগ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে৷ প্রাউটের এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কৃষিনির্ভর মানুষের হার কিছুতেই ৪০-এর ওপরে উঠতে দেওয়া উচিত হবে না৷ জনসংখ্যার আনুমানিক ২০ শতাংশের মত মানুষ থাকবে কৃষিনির্ভর শিল্পে৷ ২০ শতাংশ থাকবে কৃষি সহায়ক শিল্পে৷ ১০ শতাংশের মত মানুষ থাকবে সাধারণ ব্যবসায়, বাকী ১০ শতাংশ থাকবে বুদ্ধিজীবী বা চাকুরীজীবী বা অন্যান্য সরকারী কাজে৷ এর পরেও থাকে অকৃষি শিল্প৷ এই অকৃষি শিল্পের হার ঠিক করতে হবে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অকৃষি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা থেকে৷ অকৃষি শিল্পের নিয়োগ হবে উপরে উল্লিখিত শতাংশের হার প্রয়োজনমত কমিয়ে৷ এইভাবে কৃষি-শিল্পের ভারসাম্য বজায় রেখে গ্রাম্য জীবনে গড়ে উঠবে সুসন্তুলিত সামাজিক-অর্থনৈতিক সংরচনা৷
1
- Log in to post comments