‘সবকা বিকাশ’ অর্থাৎ সমাজের প্রত্যেক মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক উন্নয়ন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ উন্নয়নের সুফল যদি সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষের কাছে পৌঁছায়, তবেই সেই উন্নয়নকে প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন উন্নয়ন বলা যায়৷ কিন্তু প্রশ্ণ হল, পুঁজিবাদ-নির্ভর এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা যেখানে ক্রমশ কিছু ব্যক্তি, কর্র্পেরেট প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, সেখানে কি সত্যিই সকলের সমান ও সুষম বিকাশ কি সম্ভব?
উত্তর হবে--- নিশ্চয়ই না৷
কারণ পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফার উদ্দেশ্য, বাজারের প্রতিযোগিতা এবং পুঁজি বিনিয়োগের স্বাধীনতা৷এখানে সবকা বিকাশ শব্দটাই মূল্যহীন৷
দেশের সম্পদ যখন মুষ্টিমেয় কয়েকজন কুক্ষিগত করে রাখে, তখন আর্থিক বিকাশ নয়, আর্থিক বৈষম্য বাড়তে থাকে৷ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রতিবেদনে সেই তথ্যই উঠে এসেছে৷ সম্পদ, উৎপাদন, বাজার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমশ সীমিত সংখ্যক মানুষের হাতে চলে যায়৷ এর ফলে সমাজের একদিকে বিপুল সম্পদশালী শ্রেণি তৈরি হয়, অন্যদিকে বহু মানুষ নূ্যনতম জীবনযাত্রার সামর্থ্যটুকু জোগাড় করতেই হিমশিম খায়৷ সরকার সে বিষয়কে গোপন রেখে জিডিপি বৃদ্ধির অলীক প্রচার করে আর্থিক বিকাশের বাহবা কুড়াতে চায়৷
শুধু জাতীয় আয় বাGDP বৃদ্ধি পেলেই যে প্রত্যেক মানুষের জীবন যাত্রার মান একইভাবে উন্নত হবে এমন নিশ্চয়তা নেই৷ এখানে প্রাউটের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয় অর্থনৈতিক বিকাশের সুফল যদি আয়, সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সুযোগের ক্ষেত্রে সমভাবে বিস্তৃত না হয়, তাহলে জিডিপি ‘বৃদ্ধি’ ঘটলেও সর্বশ্রেণীর মানুষের ‘সর্বজনীন বিকাশ’ কখনোই সম্ভব নয়৷
পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রেGDP একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক৷ কিন্তু মানুষের প্রকৃত কল্যাণ কেবলGDP দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না৷ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপদ বাসস্থান, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ৷
অতএব, একটি দেশে উৎপাদন ও জাতীয় আয় বাড়লেও যদি সেই সম্পদের বড় অংশ সমাজের সীমিত একটি অংশের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে তাকে কখনোই ‘সবকা বিকাশ’ বলা যায় না৷
প্রাউটের দৃষ্টিতে ‘সবকা বিকাশ’ বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তে বিকেন্দ্রী করণ গুরুত্বপূর্ণ৷ স্থানীয় উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, সমবায় ব্যবস্থা, কৃষির উন্নয়ন, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব দিতে হবে৷ উন্নয়নের সাফল্য কেবল দেশের মোট সম্পদ কত বেড়েছে তা দিয়ে নয় সেই সম্পদের সুফল সমাজের শেষ সারির মানুষটির জীবনেও কতটা পৌঁছেছে, তার মাধ্যমেই বিচার করতে হবে৷
- Log in to post comments