বাঙলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সুভাষচন্দ্র ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ থাকবে৷ যদিও সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন তুলনাই হয় না৷ পারিবারিক কৌলিন্যে, শিক্ষাগত যোগ্যতায়, রাজনৈতিক দূরদর্শীতায়--- কোন দিক থেকেই নয়৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও কোনদিন সেই স্পর্ধা দেখাননি, দেখাবেন না৷ তবে বাঙলার রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার বিচারে সুভাষচন্দ্রের পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম থাকবে৷ দুজনকেই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ঘরে-বাইরে যে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, তা বাঙলার আর কোন রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীকে সেই বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়নি৷
১৯৩৮ সাল, জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে জয়ী হলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ ওই বছরই কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সামনে এক ভাষণে সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন --- দেশীয় পুঁজিপতিরা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে শক্তি জোগাচ্ছে৷ আমাদের এদের বিরুদ্ধেও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ জনগণকে শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও দিতে হবে৷ সুভাষচন্দ্রের এই বক্তব্যে দেশীয় পুঁজিপতিদের কপালে ভাঁজ পড়ারই কথা৷ এরপরও দেশীয় পুঁজিপতিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক জাতীয় কংগ্রেসের অসংবিধানিক প্রধান এম কে গান্ধী ও তার অনুগামীরা নিশ্চয়ই চাইবেন না সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হন৷ ঘটলোও তাই৷ গান্ধী ও তার অনুগামীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও গান্ধী মনোনীত প্রার্থী সীতারামাইয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয়বার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ শুরু হলো গোবলয়ের নিকৃষ্ট রাজনীতির খেলা৷ গান্ধী অনুগামীরা গান্ধীকে হিটলার স্টালিন মুসোলিনির সঙ্গে তুলনা করে জানালেন কংগ্রেসে গান্ধীজীর কথাই শেষ কথা৷ নিরুপায় সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদ ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেন৷
সুভাষচন্দ্রের প্রতি জাতীয় কংগ্রেসের গোবলয়ের গান্ধী ও তার অনুগামীদের দুর্ব্যবহারের জবাব দিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক ঐতিহাসিক পত্রে৷ সুভাষচন্দ্রকে লিখিত সেই পত্রে বিশ্বকবি লিখলেন---
সুভাষচন্দ্র,
বাঙালী কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি৷ সেই পত্রের ছত্রে ছত্রে তিনি লিখেছিলেন--- আত্মীয় পরের হাতে বাঙালীকে অশেষ লাঞ্ছনা ভোগের কথা৷ তিনি লিখলে--- হিংস্র দুঃসময়ের পিঠের ওপর চড়ে বাঙালীকে বিভীষিকার পথ উত্তীর্ণ হতে হবে৷
দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ণে বিভোর সুভাষচন্দ্র বোস বিশ্ব কবির সেই পত্রের মর্মকথা হয়তো অনুধাবন করতে পারেননি অথবা ভেবেছিলেন আগে বহিঃশত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা তারপর ঘরের শত্রু৷ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, কংগ্রেস, আরএসএস ও তথাকথিত বাম পন্থার মুখোশধারী কমিউনিস্ট সকলের সম্মিলিত চক্রান্তের শিকার হয়ে সুভাষচন্দ্র বাঙলা তথা ভারতের রাজনীতি থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন৷ তার আগে দেশ ত্যাগ করে জার্মান হয়ে জাপানে গিয়ে আর এক বাঙলার মহান বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর হাতে গড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন৷ ..... তারপর সুভাষ চন্দ্রের শেষ পরিণতি আজও অজ্ঞাত৷ আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে তিনি নেতাজি হয়ে থেকে গেলেন, কিন্তু বাংলাদেশের দেশনায়ক আর হতে পারলেন না৷ হতে দেওয়া হয়নি৷ সুভাষচন্দ্র সেদিন সফল হলে আজ ভারতের মানচিত্র অন্যরকম হতো৷ বাঙালীরও এই দুরবস্থা হতো না৷
১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তের পাশাপাশি আর এক অন্য খেলা শুরু হল৷ যে খেলার খলনায়ক ছিল দেশীয় পুঁজিপতি৷ সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর যারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল এই ভেবে যে সুভাষের হাত ধরে যদি দেশে স্বাধীনতা আসে তবে দেশীয় পুঁজিপতিদের শোষণের জাল ছিন্ন হয়ে যাবে৷ তাই শুধু সুভাষচন্দ্র নয়, বাঙালী জাতিটাকেই ধবংস করার এক নিকৃষ্ট ষড়যন্ত্র সেই দিন শুরু হয়েছিল৷
১৯৪০ সালের ১১ই জানুয়ারি দেশীয় পুঁজিপতিদের অন্যতম কর্ণধার জি.ডি বিড়লা বড়লাট লর্ড লিনলিথগোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ধর্মমতের ভিত্তিতে দেশভাগের প্রস্তাব দেন৷ ওই বছরই ৮ই মার্চ গান্ধীর ব্যক্তিগত সচিব মহাদেব দেশাইকে একপত্রের মাধ্যমে ওই একই প্রস্তাব দেন ও বলেন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্বের সমাধান দুটি পৃথক রাষ্ট্রের মাধ্যমেই হবে৷ দেশভাগের জন্য পাকিস্তান যদি জিন্নাকে কৃতিত্ব দেন তবে ভারতীয় হিন্দু সংগঠনগুলো শ্যামাপ্রসাদকে কৃতিত্ব দেন৷ আসলে জিন্না শ্যামাপ্রসাদ দাবার বড়ে মাত্র৷ আসল খেলোয়াড় দেশীয় পুঁজিপতি ও জাতীয় কংগ্রেসের সুভাষচন্দ্র তথা বাঙালী বিদ্বেষী গোবলয়ের নেতৃত্ব৷
পুঁজিপতিদের চক্রান্ত সার্থক করে, দেশ ভাগ করে স্বাধীনতা এলো৷ দেশভাগের বলি হল বাঙালী৷ নতুন করে ঔপনিবেশিক শোষণের শিকার হল বাঙলা৷ নেহেরু থেকে নরেন মোদী সেই শোষণ একইভাবে চলেছে৷ শুধু বাংলার প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক ধন-সম্পদ নয়, বাংলার উন্নত কৃষ্টি-সাহিত্য সংস্কৃতিকেও ধবংস করা হয়েছে হচ্ছে৷ বিধান রায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দিল্লির ওই শোষণের বিরুদ্ধে কোন মুখ্যমন্ত্রী মুখ খোলেনি৷ এমনকি পাঞ্জাব যেভাবে তার উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে কেন্দ্রের কাছথেকে ন্যায্যপ্রাপ্যর বেশি আদায় করে নিয়েছিল, বিধান রায় তার ছিটেফোঁটাও আদায় করতে পারেনি, হয়তো নেহেরুর বিশেষ বন্ধু বিধান রায় সেদিন বাঙলার স্বার্থ অপেক্ষা নেরুর সঙ্গে বন্ধুত্বকে বড় করে দেখেছিলেন৷
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৬৪ বছর পর সিপিএমের ৩৪ বছরের রাজত্বে খুন সন্ত্রাস লুন্ঠন ধর্ষণ অপশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই করে ২০১১ সালে মমতা বন্দোপাধ্যায় হলেন বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী৷ মানুষের অনেক আশা ভরসা ছিল তার প্রতি৷ স্বাধীনতার পর বাংলার আর কোন নেতা এতটা জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় বসেননি৷ কিন্তু একদিকে কংগ্রেস সিপিএম বিজেপির মত শক্তিশালী রাজনৈতিক দলগুলির চক্রান্ত, সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের কারণে দেশীয় পুঁজিপতিদের চক্রান্ত ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু পারিষদবর্গের প্রভাবে পড়ে ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতিতে বাঙলা আজ সত্যি হিংস্র দুঃসময়ের সম্মুখীন৷ যে সিপিএম হার্মাদদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে বাঙলার মানুষ ক্ষমতায় এনেছিল সেই হার্মাদদের অনেকেই পাড়ায় পাড়ায় হয়ে গিয়েছিল তৃণমূলের মাতবর৷ সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসনে অনেক দুর্নীতি অত্যাচার খুন সন্ত্রাস ধর্ষণ চললেও গো বলয়ের মতো ঘোড়া কেনাবেচার রাজনীতি বাঙলায় অনুপ্রবেশ করেনি৷ তৃণমূল শাসনে আসার পর বহুরূপী সরীসৃপের মত রাজনীতির রং বদল করায় বাঙলা গোবলয়কে হার মানাচ্ছে৷ যে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের শোষণে বাঙলার সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামো জরাজীর্ণ হয়েছে, যেই সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে প্রতিহত করার চেষ্টা না করে রাজ্যে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় খুলে হিন্দি ভাষীদের বাঙলায় আরো শক্ত জমি তৈরি করে দিলেন বিধান রায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পথ অনুসরণ করে৷
বাঙলার সর্বনাশের দায় এড়াতে পারবেন না বিধান রায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেউই৷ তবে তারা কেউ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না৷ সাম্প্রদায়িক প্রীতি দেখানোর জন্য তাদেরকে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তেও হয়নি৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িক প্রীতির আতিশয্য অনেক অসাম্প্রদায়িক হিন্দুর মনেও বিরপ প্রভাব ফেলেছে৷ তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী নানা রকম দুর্নীতির জালে জড়িয়ে পড়েছে৷ তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতনের মূল কারণ কিন্তু দুর্নীতি নয়৷ কারণ তার বহু সামাজিক প্রকল্পের সুফল পেয়ে প্রান্তিক মানুষরা মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ পেয়েছিলেন৷ তাই তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতি নিয়ে তাদের অতটা মাথাব্যথা ছিল না৷ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের অন্ধ মমতাবিদ্বেষ ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় উদারতা বাঙলায় সাম্প্রদায়িক বাঙালী বিদ্বেষী বিজেপিকে ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছে৷ তারপরও নির্বাচন কমিশনারের কেন্দ্রের শাসকদলের হয়ে পক্ষপাতিত্ব, বিপুল অর্থশক্তি, সাংঘটনিক শক্তি, প্রশাসনিক শক্তি ও রাষ্ট্রশক্তির সাহায্য ছাড়া বিজেপির পক্ষে বাঙলা দখল সম্ভব হতো না৷ আজও গ্রামবাঙলায় বিজেপির পক্ষে সেভাবে জনমত নেই৷
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সেই ঐতিহাসিক পত্রে বাঙালীকে যেমন হিংস্র দুঃসময় থেকে সাবধান করেছিলেন তেমনি আশার বাণীও শুনিয়ে গেছেন৷ তিনি লিখলেন--- অদৃষ্ট কর্তৃক অপমানিত হয়ে বাঙালী মরবে না --- প্রচন্ড মার খেয়েও বাঙালী মারের ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবে৷
হ্যাঁ, বাঙালী আবার হিংস্র দুঃসময় অতিক্রম করে মাথা তুলে দাঁড়াবে যদি সব দলীয় ও সাম্প্রদায়িক পরিচয় দূরে সরিয়ে রেখে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে --- আজ বাঙলার পরিচয় রাম নয়, বাম নয়, ডান নয়, কংগ্রেস নয়, সিপিএম নয়, বিজেপি নয়, তৃণমূল নয়৷ আজ আকাশ বাতাস মুখরিত করে আজানের সুর ধবনিত হোক মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে, মন্দিরে মন্দিরে বাজতে থাকুক শঙ্খ বাদ্য, কিন্তু বাঙলার পথে ঘাটে, বাঙলার হাটে বাজারে, বাঙলার মাঠে ময়দানে আমাদের একটি মাত্র পরিচয়---আমরা বাঙালী৷
- Log in to post comments