একবার পার্বতী শিবকে প্রশ্ণ করেছিলেন---মানুষ নানান কাজে হাত লাগায়, কোনটায় ব্যর্থ হয়, কোনটায় অর্ধেক সিদ্ধি লাভ করে আবার কোনটায় শতকরা একশভাগই সিদ্ধিলাভ করে৷ এরকমটা কেন হয়?---আর সর্বক্ষেত্রে সিদ্ধিলাভের গোপন রহস্যটাই বা কী? (what are the secret of success) উত্তরে শিব বলেছিলেন--- সাফল্যলাভের গোপন ছয়টি রহস্য বা সূত্র আছে, তা হল---
‘‘ফলিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ সিদ্ধের্প্রথমলক্ষন
দ্বিতীয়ং শ্রদ্ধয়া যুক্তম্ তৃতীয় গুরুপূজানম্,
চতুর্থো সমতাভাবো পঞ্চমেন্দ্রিয় নিগ্রহ
ষষ্টঞ্চ প্রমিতাহারঃ সপ্তমং নৈব বিদ্যতে৷৷ (শিবসংহিতা)
সাফল্যের প্রথম রহস্যটা হল---‘ফলিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ সিদ্ধের্প্রথম লক্ষ্যণম্’’৷ আমি যে ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেছি যে কাজে হাত লাগিয়েছি তাতে আমি সফল হবই হব--- এই যে সুদূঢ় আত্মপ্রত্যয়---এটাই সাফল্যের প্রথম চাবিকাঠি, I must be successful in my mission.যারা কোনো কাজ করতে গিয়ে ভাবে--- আমি কি পারব, তারা সেই কাজে আশানুরূপ সফল হয় না, মানুষ তিন প্রকার ---উত্তম, মধ্যম ও অধম৷ অধম শ্রেণীর ব্যষ্টিরা বাধা আতে পারে এই ভেবে কোনো কাজে হাত লাগায় না, মধ্যম শ্রেণীর ব্যষ্টিরা কাজ শুরু করে কিন্তু বাধার সম্মুখীন হলেই তারা মাঝপথে কর্ম থেকে বিরত হয়৷ কিন্তু উত্তম শ্রেণীর ব্যষ্টিরা অগ্র-পশ্চাৎ সবদিক চিন্তা করে কোনো কাজে হাত লাগান৷ কিন্তু যাকে আদর্শ বলে মেনেছেন, উচিত কাজ ভেবেছেন যত বাধা-বিপত্তি আসুক না কেন তাঁরা সেই কাজ থেকে বিরত হন না, ভাগ্যলক্ষ্মী এরূপ দৃঢ়চেতা ব্যষ্টির গলাতেই বিজয় মাল্য অর্পন করেন৷
‘দ্বিতীয়ং শ্রদ্ধয়া যুক্তম্’---আমি যে কাজে হাত লাগিয়েছি, সেই কাজের প্রতি আমার শ্রদ্ধা থাকতে হবে, আস্থা থাকতে হবে৷ পিতা মাতারা অনেক সময় তাঁদের ছেলে-মেয়েদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভাললাগা-মন্দলাহাকে মান্যতা না দিয়ে নিজেদের সুপ্ত মনস্কামনা পূরণে প্রয়াসী হন৷ এতে ফল বহুক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়৷
‘তৃতীয়ং গুরুপূজনম্’---‘গু’ শব্দের অর্থ অন্ধকার, ‘রু’ শব্দের অর্থ দূর করা বা বিদূরক সত্তা৷ যিনি আমাদের জাগতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক অন্ধকার দূর করেন তিনিই গুরু৷ গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতেই হবে, গুরুর মনোমত কর্ম করলেই গুরুপূজার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়৷
‘চতুর্থ সমতাভাবঃ’--- মনে সমতাভাব রাখতে হবে সর্বক্ষেত্রে মানসিক ভারসাম্য (Balenced mind) থাকা দরকার মনে হীনমন্যতা )Inferiority complex), মহামান্যতা Superiarity complex), ভীতমন্যতা (Fear complex) কোনটাই রাখা চলবে না, যে মানুষটা নিজেকে বড় বলে ভাবে সে মনের রোগে ভুগছে৷ আবার যে মানুষটা নিজেকে ছোট বলে ভাবে সেও মনের রোগে ভুগছে৷ মন থাকবে সম্পূর্ণ সাম্যাবস্থায়৷
‘পঞ্চমন্দ্রিয় নিগ্রহ’ঃ--- কোনো বড় কাজ করতে হলে ইন্দ্রিয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতেই হবে৷ পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক) ও পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় (বাক্ পানি, পাদ, পায়ু উপস্থ) নিজের বশে থাকলে কার্যসিদ্ধি ত্বরান্বিত হবে বুদ্ধ বলেছেন---
‘‘চক্খুনা সংবরো সাধু, সাধু শোতেন সংবরো,
ঘ্রানেন সংবরো সাধু, সাধু জিহ্বায় সংবরো,
কায়েন সংবরো সাধু, সাধু বাচায় সংবরো,
মনসা সংবরো সাধু, সাধু সববত্থ সংবরো,
সববত্থ সংবরো ভিক্ষু, সবব দুখম্ প্রমুচ্চতি৷৷’’
‘ষষ্ঠঞ্চ প্রমিতাহারঃ’--- খাদ্যবিশারদরা সবাইকে পরিমিত আহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন৷ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই খেলাম, বেশী নয়, আবার কমও নয়৷ কিন্তু এখানে প্রমিতাহারের কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ আহার শুধু সীমিত হলেই চলবে না, তাকে পুষ্টিগুণযুক্ত হতে হবে৷
‘সপ্তমং নৈব বিদ্যতে’--- উপরিউক্ত ছটি সূত্রই যথেষ্ট৷ সপ্তম সূত্রের আর প্রয়োজন থাকে না৷ মহান দার্শনিক, ঋষি, যোগগুরু, ধর্মগুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তি শিবপ্রদত্ত কার্যসিদ্ধির এই ছটি সূত্রকে মান্যতা দিয়ে আধ্যাত্মিক সাধকদের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত আর একটি সূত্র যোগ করেছেন৷ তা হল --- যখনই অবকাশ হবে --- একটু কীর্ত্তন করতে হবে তাতে মন শুদ্ধ হবে এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি ত্বরান্বিত হবে৷
- Log in to post comments