ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের যেসব বিপ্লবী অকাতরে জীবন বিসর্জন দিয়ে অগ্ণি আমার আকাশের গায়ে নাম লিখে গেছেন তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও নিতান্তই কম নয়৷ আজ এমন একজন নারীর কথা বলব যার অসীম সাহস ও স্বেচ্ছায় আত্মত্যাগ ভারতের স্বাধীনতা আনয়নের পথ যথেষ্ট সুগম করেছিল৷
ব্রিটিশ শাসনে ও শোষণে জনগণ যখন বিক্ষুব্ধ ঠিক সেই সময় প্রবর্তিত হল সাইমন কমিশন৷ ফলে জনগণের বিদ্রোহী অগ্ণিতে যেন ঘৃতাহুতি হল৷ সাইমন কমিশনকে কেউই সুনজরে দেখলো না৷
কমিশনের সদস্যরা যেখানেই যান সম্বর্ধনা দূরের কথা কেবল গালিগালাজ আর অসম্মান সূচক স্লোগান পুরস্কার স্বরূপ নিয়ে আসেন৷
ভারতের হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই রুখে দাঁড়ালো সায়মন কমিশনের বিরুদ্ধে৷
ভারতের ভাগ্যাকাশে ছড়িয়ে পড়লো কালো মেঘ৷
১৯৩০ সাল গান্ধীজীর শুরু করলেন লবণ আন্দোলন৷ এই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লো সারা ভারতে৷
১৮ই এপ্রিল৷
চট্টগ্রামে উঠলো তুমুল ঝড়৷ সশস্ত্র বিপ্লবী দল হুংকার দিয়ে উঠলো৷ আকাশ মাটি কাঁপিয়ে ফাটতে লাগলো বোমের পর বোম৷
রাত তখন সোয়া দশটা৷
লোকনাথ বল, নির্মল সেন, রজত সেন, মনোরঞ্জন সেন, ফণী নন্দী, সুবোধ ঘোষ আর জীবন ঘোষাল ট্যাক্সি করে চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগারের দরজায় পৌঁছলেন৷ উচ্চপদস্থ সেনানির ছদ্মবেশে লোকনাথ অস্ত্রাগারের বারান্দায় উঠতেই একটি প্রহরি তাকে বাধা দিল৷
লোকনাথের পিস্তল গর্জে উঠল--- গুড়ুম!
সঙ্গে সঙ্গে প্রহরীর দেহ লুটিয়ে পড়লো মাটিতে৷
পিস্তলের আওয়াজ শুনে অস্ত্রাগারে ভারপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মেজর ফারেল ত্রস্তচকিতে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে৷ বিপ্লবীর গুলিতে তিনিও লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে৷ আর উঠলেন না৷ অন্যান্য প্রহরীরা যেদিকে পারলো পালিয়ে গেল৷
বিপ্লবীরা অস্ত্রশস্ত্র লুট করে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পালিয়ে গেলেন৷ অস্ত্রাগারে ধরিয়ে দিলেন আগুন৷
অনন্ত সিংহ আর গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে পাঁচ জন সেনানি বেশি বিপ্লবী পুলিশ হেডকোয়ার্টার আক্রমণ করে দখল করে নিল৷
অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে জনকয়েক বিপ্লবী টেলিগ্রাম ও টেলিফোন দখল করে এক্সচেঞ্জ বোর্ডকে ভেঙে চুরমার করে দিল৷
বিপ্লবীরা রেললাইন সরিয়ে দিয়ে চট্টগ্রাম কে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলল৷
বিপ্লবীরা সকলে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে একত্রিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন টেম্পোরারি গভর্ণমেন্ট৷ সভাপতি নির্বাচিত হলেন মাস্টারদা সূর্যসেন৷
রাত্রি তখন দুটো৷
মুহূর্মূহ মেশিনগানের গুলি ছুটে আসতে লাগলো হেডকোয়ার্টারের দিকে৷ বিপ্লবীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেডকোয়ার্টার থেকে পালিয়ে গেলেন৷ কয়েকজন আত্মগোপন করলেন জালালাবাদের পাহাড়ে৷ বিপ্লবী হিমাংশু সেন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আগুন ধরিয়ে দিলেন৷
কয়েকদিন উভয় পক্ষই চুপচাপ৷
২২এপ্রিল আবার সংঘর্ষ শুরু হল৷ সরকারি পুলিশ ও সৈন্যরা জালালাবাদ এর পাহাড় চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলল৷
বিপ্লবীরা বীর বিক্রমে গুলি ছুঁড়তে লাগলেন তাদের দিকে৷ সারাদিন যুদ্ধ করে সন্ধ্যা সাতটার সময় তারা জয়ী হলেন৷
১লা সেপ্ঢেম্বর৷
সরকারি সৈন্য বিপ্লবীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ বাধলো চট্টগ্রামের হলঘাট গ্রামে৷ এই গ্রামে সাবিত্রী দেবীর নামে এক বিধবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সূর্য সেন, নির্মল সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত আর অপূর্ব সেন৷
সৈন্যরা তাদের ঘেরাও করলো৷
সূর্য সেন, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার সৈন্যদের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে গেলেন৷
বাদবাকি সবাই ধরা পড়লেন৷ কারো হলো ফাঁসি কারো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কারো বা দ্বীপান্তর বাস৷ সূর্যসেন তখনও মুক্ত৷ চট্টগ্রামের উপকণ্ঠে পাহাড়তলীতে ইউরোপীয়দের ক্লাব৷ ক্লাবটা রেল স্টেশনের কাছেই অবস্থিত৷ প্রতি শনিবার রাত্রে এই ক্লাবে উচ্চপদস্থ রেলওয়ে অফিসার ও ইউরোপিয়ানরা আমোদ প্রমোদে মেতে ওঠে৷ অনেক বদমাইশ সাহেবও তাতে যোগ দিতেন৷
সূর্যসেন ঠিক করলেন ক্লাবটা আক্রমণ করতে হবে কিন্তু নেতৃত্ব দেবেন কে চিন্তিত হলেন সূর্য সেন৷
এমন সময় তার সামনে এসে দাঁড়ালেন এক নির্ভীক নারী৷ বুদ্ধিদীপ্ত তার চেহারা৷ শরীরের গঠন নারীসুলভ লতার মত অবনত নয়---রীতিমতো সুঠাম ও শক্ত সবল৷ কে তিনি? চট্টগ্রামের বীর কন্যা৷ কি নাম? প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার৷
সংসারের কঠোর দারিদ্র্য তাকে কাবু করতে পারেনি৷ মেয়েরাও যে দুর্বলতা আর ভয়ের ঘুমটা খুলে লজ্জার শিথিলতা কাটিয়ে মহাসংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারেন তারই জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এই প্রীতিলতা৷ ছেলেবেলা থেকেই তার সংগঠনমূলক কাজে উৎসাহ ছিল৷ স্কুল লাইফে তিনি গার্লস গাইডে নিযুক্ত ছিলেন৷ লাঠি খেলায় তিনি ছিলেন ওস্তাদ৷ অস্ত্রচালনায় ও তার জুড়ি পাওয়া ভার৷
পিতার সামান্য চাকরিটা যখন খোয়া গেল সংসারে যখন দুর্ভাবনার কালো মেঘ ঘনিয়ে এলো প্রীতিলতা তখন চাকরির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন৷ একটা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষায়ত্রী চাকরি পেয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে৷ কিন্তু আয় সামান্য সংসার চালানো দায়,বাবা-মা বুড়ো হয়েছেন৷ চার চারটে ভাই বোন তার মাথার উপর৷ অবসর সময়ও কিছু ছাত্রী পড়িয়ে কোনো রকমে সংসার চালাতে লাগলেন৷ কিন্তু তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারতের ৩৩ কোটি অসহায় নরনারীর পান্ডুর ম্লান মুখ৷ ইংরেজ সরকারের শাসনে শোষণে নিপীড়িত লাঞ্ছিত ব্যথিত ভারতের আবাল বৃদ্ধ বণিতার আর্তনাদ তাকে ক্ষণে ক্ষণে চঞ্চল করে তোলে৷ পরাধীন ভারতের মুক্তির আহ্বানে তিনি সাড়া না দিয়ে পারলেন না৷
যোগ দিলেন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের সাথে৷ স্বেচ্ছায় গ্রহণ করলেন---গুরুভার বিপদসংকুল নেতৃত্ব৷
২৪শে অক্টোবর ১৯৩২ সাল শনিবার রাত্রি৷
ক্লাবে উল্লাসের ঢেউ বইছে৷ অফিসাররা প্রমোদে গা ভাসিয়েছেন৷ হাসি-ঠাট্টা তামাশার বান ডেকেছে৷
অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে অদূরে অপেক্ষা করছেন অগ্ণিকন্যা প্রীতিলতা৷ সাথে তাঁর আটজন অনুগামী৷ ক্লাবের সদস্যরা ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে তাদের দুয়ারে স্বয়ং যম এসে উপস্থিত হয়েছেন৷
রাত্রি ন’ টা৷
সুযোগ বুঝে অতর্কিতে আক্রমণ করলেন প্রীতিলতা৷
নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল হাসির রোল৷
চট্টগ্রামের মাটি কেঁপে উঠলো৷ মূহুর্মূহু বোমার হুংকার৷ আকাশ পাতাল আলোড়িত হল শুধু পিস্তলের অবিরাম গর্জন৷ সাদা চামড়া লাল রক্তে ভেসে গেল ক্লাবের মেঝে৷
অক্ষত দেহ ফিরে এলেন বিপ্লবীরা৷
কিন্তু তাদের নেত্রী প্রীতিলতা রেহাই পেলেন না৷ একটি বোমার টুকরো তার বুকের অনেকখানি ভেতরে ঢুকে গেছে৷ টলতে টলতে তিনি বেরিয়ে এলেন ক্লাব থেকে৷ সঙ্গীতের ইশারা করে পালাতে বললেন৷ তিনি বুঝতে পেরেছেন তার জীবন প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে৷ শরীর অবসন্ন রক্তে ভেজা ছপছপে বুকে হাত দিয়ে ক্লাব ভবন থেকে কিছু দূরে এগোলেন৷ বজ্জাত ইংরেজের হাতে তিনি ধরা দেবেন না৷ মৃত্যুর জন্যে তিনি তৈরি হয়ে এসেছেন৷ ধীরে ধীরে কোমরের গুপ্ত স্থান থেকে বের করলেন সায়ানাইড৷ জীবনঘাতী বিষ৷ সেই বিষ মহা শান্তিতে মুখে পুরে দিলেন তিনি লুটিয়ে পড়লেন মাটির কোলে৷ মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো---‘বঙ্গ আমার, জননী আমার৷
- Log in to post comments