আজ আমরা বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকা নন্দের জন্মদিবস পালন করছি৷ তিনি যদিও এই মর জগতে বেশীদিন ছিলেন না তবুও বলতেই হয় তিনি ভারত–আত্মাকে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন ও সেই মতো জগৎ–কল্যাণে কাজ করে গেছেন৷ তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল পরাধীন ভারতে৷ তিনি ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দে ১২ই জানুয়ারী কলকাতার সিমলা পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত দত্ত পরিবারে৷ তিনি বাল্যকাল থেকেই অত্যন্ত জেদী, উৎসাহী, সেবাপরায়ণ ছিলেন৷ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন৷ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পাশ করেন৷ তাঁর দর্শন শাস্ত্রের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল৷ বিখ্যাত দর্শনের অধ্যাপক শ্রী ব্রজেন শীলের খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি৷ কান্ট ও হেগেল–এর যুক্তিবাদকে তিনি খুবই মান্যতা দিতেন৷ তিনি দক্ষিণেশ্বরের কালীমন্দিরে বিখ্যাত সাধক শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন৷ তাঁর প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তিনি সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হন৷ তাঁর সন্ন্যাস–জীবনে নাম হয় স্বামী বিবেকানন্দ৷ তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল শ্রীনরেন্দ্রনাথ দত্ত৷ বাল্যকালে ‘বিলে’ নামে পরিচিত ছিলেন৷ তাঁর রচিত জ্ঞান, ভক্তি, কর্মযোগ খুবই বিখ্যাত বই৷ তিনি ভারতের পরাধীনতাকে সহ্য করতে পারেন নি৷ কারণ পরাধীন জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না৷ এটাই ছিল তাঁর বিশ্বাস৷ তিনি আমেরিকার চিকাগো বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে ভারতের হিন্দু ধর্মের সন্ন্যাসী হিসাবে বক্তব্য রাখেন৷ তিনি যখন মঞ্চে উঠে বললেন, ‘‘আমার আমেরিকার প্রিয় ভাই ও ভগ্ণীগণ’’, তাঁর এই সম্বোধন সকল শোতৃমণ্ডলীকে সম্মোহিত করে৷ তাঁর ৫মিনিটের বত্তৃণতাকে কর্ত্তৃপক্ষ বাড়িয়ে দেন৷ ভারতের অধ্যাত্ম দর্শনকে জগতে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে প্রচার করেন৷ তিনিই ভারত আত্মার মূর্ত্তপ্রতীক হিসাবে আমেরিকায় উপস্থিত হয়ে ভারতের অধ্যাত্ম–বিজ্ঞান ও দর্শনকে এক সুউচ্চ স্তরে উপস্থাপন করেন৷ তিনি সারা ইউরোপ ভ্রমণ করেন৷ তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান অবদান হলো সিস্টার নিবেদিতাকে পরাধীন ভারতের সার্বিক কল্যাণের কাজে লাগানো৷ গ্রেট ব্রিটেনের মার্গারেটকে দীক্ষা দিয়ে তিনি ভারতে নিয়ে আসেন ও ভারতের কল্যাণে উৎসর্গ করেন৷ সারাজীবন দেবী স্বরূপিনী সিস্টার নিবেদিতা ভারতের কল্যাণে ব্রতী হয়ে ভারতের জনগণের সার্থক ভগ্ণী হিসাবেই বিখ্যাত হয়ে আছেন৷ তাঁরই প্রচেষ্টায় পরাধীন দেশের আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসাবে খ্যাত হওয়ার অনেক সুযোগ পান৷ তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নানাভাবে সারাজীবন সাহায্য করে গেছেন৷ সেবা ও নারী শিক্ষার দিকে নিবেদিতা জোর দেন৷ এই সবই স্বামীজীর প্রেরণা ও উৎসাহের সুফল হিসাবে ধরা যায়৷ স্বামীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ভারতের মুক্তি সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেন৷ সুভাষচন্দ্র ছিলেন স্বামীজীর মানস পুত্র৷
তাঁর মতে মানুষ আধ্যাত্মিক জীব৷ মানুষের জন্ম আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্য দিয়ে মুক্তি লাভ আর যতদিন মানুষের শরীর এই পাঞ্চভৌতিক জগতে থাকবে ততোদিন জগৎ কল্যাণে শিব–জ্ঞানে জীব–সেবা করে যাওয়াটাই হলো সার্থক মানুষের কর্ম৷ তিনিও ভক্তিমার্গকে উচ্চে স্থান দিয়ে গেছেন৷ জ্ঞান ও কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে চলতে হবে সেই মোক্ষ বা মুক্তির লাভের উদ্দেশ্যে৷ তিনি হলেন ভারতের এক আদর্শবান সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী৷ ভারত কর্মভূমি, ভোগভূমি নয়৷ তাই ভারতের কর্ত্তব্য হলো বিশ্বকে পথ দেখানো৷
- Log in to post comments