ভারত থেকে বাঙালী জনগোষ্ঠীকে অবলুপ্ত করার শুরুটা হয়েছিল সুভাষচন্দ্র কে দিয়ে, সেই যে শুরু হয়েছে শেষের সেদিন এখনো এলো না৷ বাঙালী জনগোষ্ঠীকে অবলুপ্ত করা যে সম্ভব নয়, সেটা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বুঝেছিল, কিন্তু দিল্লির শাসক সেটা দেখেও শিক্ষা নেয়নি৷ তার অন্যতম করান হয়তো ভারতীয় বাঙালীদের একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে বর্গী রক্তের মিশ্রন থাকায়৷ তাই রাজ্যে রাজ্যে এত বাঙালী নির্যাতনের পরও এক শ্রেণীর বাঙালী উল্লাসে মেতে ওঠে৷ কিন্তু বাঙালী আর কত সহ্য করবে গণতন্ত্রের বেদীতে ফ্যাসিস্টের বলাৎকার! ১৯৩৯ সালে গান্ধীর অমতে গান্ধী মনোনীত প্রার্থী পট্টোভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র দ্বিতীয়বার কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলেন৷ অহিংসার পূজারী অহিংসার মুখোশ খুলে স্বরূপে প্রকাশিত হলেন৷ নিজের মনোনীত প্রার্থীর পরাজয় মেনে নিতে পারলেন না৷ ব্যঙ্গ করে বললেন---সীতারামাইয়ার পরাজয় আমার পরাজয়---হাজার হোক সুভাষবাবু দেশের শত্রু নয়৷ সত্যি! অহিংসার পুজারীর কি মাহাত্ম্যের পরিচয়!
তবে গণতন্ত্রের বেদীতে এই পরাজয় লজ্জার বা হতাশার নয়৷ সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কে স্বীকার করে নিয়ে সঙ্ঘবদ্ধভাবে লক্ষ্যের পানে এগিয়ে চলাই গণতান্ত্রিক রীতি৷ কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের মত কে মর্যাদা দিয়ে রাজনৈতিক পরাজয় কে স্বীকার করে নেওয়ার মতো সৌজন্যতাবোধ মহাত্মাজির ছিল না৷ সেইদিনই গুজরাট প্রদেশের মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ও তার সাঙ্গোপাঙ্গদের ফ্যাসিস্ট হুংকার শোণা গেল গণতন্ত্রের বেদী থেকে৷ এক গান্ধী ভক্ত প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে মুসোলিনি, হিটলার ও স্ট্যলিনের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর তুলনা করলেন! নিরব থেকে ফ্যাসিষ্ট শক্তির আস্বাদন উপভোগ করলেন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধী৷
গণতন্ত্রের বেদীতে ফ্যাসিষ্টের ফোঁস দেখে মুখ খুললেন ব্যথিত কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ কাকস্য পরিবেদনা! পশ্চিমভারতীয় ফ্যাসিস্ট রাজনীতির ধারক কবির কথায় কর্ণপাত করলেন না৷ চক্রান্তের জাল আরও ঘনীভূত হলো৷ পশ্চিমভারতীয় নিকৃষ্ট রাজনীতির বিষাক্ত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আপন আদর্শে অটল থেকে কংগ্রেস সভাপতির পদ ত্যাগ করলেন সুভাষচন্দ্র৷ এক ঐতিহাসিক পত্রে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুভাষচন্দ্রকে বাঙলাদেশের অধিনায়ক পদে বরণ করলেন৷ সেই পত্রের ছত্রে ছত্রে তিনি বাঙলার আজকের দুর্দিনের ছবি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন৷ সুভাষচন্দ্র হারিয়ে গেলেন৷ কিন্তু বিধানচন্দ্র রায় সহ বাঙালী নেতারা সেই পত্রের মর্ম উপলব্ধি করতে পারলো না, নাকি ইচ্ছা করে করেননি!
গান্ধী-পটেলের নিকৃষ্ট পশ্চিমী রাজনীতির শিকার হয়ে হারিয়ে গেলেন সুভাষচন্দ্র৷ মধ্যরাতের অন্ধকারে ভিক্ষালব্ধ স্বাধীনতায় বাঙালী আর এক ষড়যন্ত্রের শিকার হলো৷ যে ষড়যন্ত্রের রচনাকার গান্ধী পটেল-নেহেরু৷ সেই মধ্যরাত থেকেই আর্থিক দিক থেকে যেমন বাঙলাকে বঞ্চিত করা শুরু হয় তেমনি ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিকে অবদমিত করা শুরু হয়৷ গান্ধী নেহেরুর সেই পরিকল্পনাই আজ মোদি শাহের হাতে সম্পূর্ণ করার ভার পড়েছে৷ স্বাধীনতার পূর্বে গণতন্ত্রের বেদীতে যে ফ্যাসিষ্টের হুংকার শোণা গিয়েছিল, গণতন্ত্রের সেই বেদী আজ ফ্যাসিষ্ট শাসকের দখলে৷ বার বার নির্বাচনে পরাজিত হয়ে দিল্লির ফ্যাসিষ্ট শক্তি উন্মাদ হয়ে গেছে৷ আর্থিক বঞ্চনা তো রয়েছে এইবার বাঙালী জনগোষ্ঠীকেই বিনাশ করার পরিকল্পনা নিয়েছে মোদি শাহের সরকার৷
এখন প্রশ্ণ বাঙালী কি পশ্চিম ভারতীয় ফ্যাসিষ্ট রাজনীতির বলি হবে? না-কি মারের ওপর মাথা তুলে দাঁড়াবে৷ মোদিশাহ হয়তো ভুলেই যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের টাকায় কেন্দ্র চলে--- কেন্দ্রের টাকায় রাজ্য চলে না৷ বাঙালী এই সত্যটা বুঝে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালে পারবে দিল্লিশ্বর রুখতে! ব্রিটিশ পারেনি৷ পশ্চিমি উর্দু সাম্রাজ্যবাদও পারেনি৷
ইতিহাস থেকে যে শিক্ষাই নিক দিল্লির অসার হিন্দুত্ব নয়---নতুন ভারত জন্ম নেবে নব্যমানবতাবাদের আনন্দ আলোকে পূর্ব দিগন্ত থেকেই৷ পশ্চিমি ফ্যাসিষ্ট শাসকের শক্তির দম্ভ স্বার্থলোভ যতই উন্মত্ত রূপ ধারণ করুক---বাঙলা কিন্তু বিহার মহারাষ্ট্র নয়৷ ব্রিটিশ বুঝেছে, উর্দু সাম্রাজ্যবাদ বুঝেছে, দিল্লিও বুঝবে--- স্বার্থের সমাপ্তি অপঘাতে৷
- Log in to post comments