রাজ্যে নবগঠিত সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল নারীর নিরাপত্তা৷ সরকার ঘটিত হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে রাজ্যে বেশ কয়েকটি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে গেছে৷ যদিও সেগুলি সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেনি৷ বলা ভালো আসতে দেওয়া হয়নি৷ কারণ বর্তমান দেশের শাসন ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার অন্যতম দুটি স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম ও বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও বিতর্ক চলছে৷ সম্প্রতি শীর্ষ আদালতের আইনজীবী প্রশান্তভূষণ ও প্রাক্তন আমলা জহর সরকার বিচার ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেছেন৷
এখন আলোচনার বিষয়ে ফিরে আসি গণমাধ্যমকে চোখ রাঙিয়ে অপরাধ ঢাকা দিলে বা বিচার ব্যবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে শাসক দলের সঙ্গে যুক্ত অপরাধীকে আড়াল করলে সমাজে কলুষতা বাড়ে ঠিকই, তবে অপরাধীকে প্রচারের আলোয় এনে বা সুবিচারের মাধ্যমে অপরাধীকে সাজা দিলেই সমাজ অপরাধমুক্ত কলুষমুক্ত হবে না৷ দিল্লির এক ধর্ষনজনিত ঘটনার পর সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ধর্ষনজনিত অপরাধ দমনে কঠোর আইন তৈরী হয়েছে৷ কোন কোন ক্ষেত্রে সেই আইন প্রয়োগও হয়েছে৷ কিন্তু তাতে সমাজ কলুষমুক্ত, অপরাধমুক্ত হয়নে৷
সুশৃঙ্খলে রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্যে আইন-আদালত পুলিশ প্রশাসনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে৷ কিন্তু সমাজকে কলুষমুক্ত করতে আইন-আদালত পুলিশ প্রশাসনই যথেষ্ট নয়৷ এই ধরনের সামাজিক অপরাধের কারণ রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার, পুঁজিবাদী শোষণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও তথাকথিত উচ্চশ্রেণীর সমাজের ভোগবাদী জীবন যাপন৷ আসলে আজকের সমাজে রাষ্ট্র নেতারাও ভোগবাদকেই জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে৷ অপরদিকে সাধারণ মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক চেতনার অভাবে ও সংবিধানের ছিদ্রপথে অসৎ মানুষ রাজনীতিতে ভীড় জমিয়েছে৷ রাজনীতি তাদের কাছে বিনা মূলধনের ব্যবসা৷ তাই সবরকম অপরাধ রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করেছে৷ অপরদিকে বিজ্ঞানের নিত্যনতুন আবিষ্কার মানুষের অঞ্জলী ভরে দিচ্ছে ভোগ্যবস্তু ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনের দ্রব্যরাশি৷ মানুষ বলগাহীনভাবে ছুটে চলেছে ভোগবাদের পিছনে৷ তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ, রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রক সবাই ভেসে চলেছে ভোগবাদের জোয়ারে৷ মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদ দুই পাশ্চাত্যের জড়বাদী দর্শনও সমাজকে ভোগবাদের দিকে ঠেলে দিয়েছে৷ যার কারণে সমাজে ব্যাভিচার বেড়ে যাচ্ছে৷
এখন প্রশ্ণ মানবসমাজকে এই দুরাবস্থার হাত থেকে রক্ষার উপায় কি৷ বিজ্ঞানের অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে দেওয়া! বিজ্ঞানের অগ্রগতি প্রকৃতির নিয়মেই হয়ে চলেছে৷ তাকে রুদ্ধ করা প্রকৃতি -বিরুদ্ধ কাজ হবে৷ বিজ্ঞানের অগ্রগতি না হলে মানুষ আজও সেই আদিমযুগে পড়ে থাকতো৷ তাই বিজ্ঞানের বিরোধিতা পথ নয়৷ পাশ্চাত্যের ভোগবাদী জীবন সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন--- ‘জড়বাদী পাশ্চাত্যের মানুষকে নতজানু হয়ে ভারতের আধাত্মিকতার কাছে দীক্ষিত হতে হবে, বাঁচবার আর কোন রাস্তা নেই৷
এ যুগের মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার তাঁর সভ্যতা, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক প্রগতি প্রবচনে বলেছেন--- ‘সভ্যতার সঙ্গে বিজ্ঞানের একটা ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে, একই সঙ্গে এ দু’য়ের উন্নতি হয়৷ কিন্তু যেখানে বৈজ্ঞানিক উন্নতি সভ্যতার উন্নতিকে পিছনে ফেলে যায় সেখানেই সভ্যতার ভরাডুবি ঘটে... সভ্যতার বিকাশ যেখানে একেবারে নগন্য, সেখানে যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতি উন্নতির উচ্চতম শিখরে পৌঁছায়, সেখানে বিজ্ঞান মানুষের কল্যাণের পরিবর্ত্তে ধবংসের পথ প্রশস্ত করে৷’
একটা কথা পরিষ্কার---সভ্যতার সঙ্গে বিজ্ঞানের ঘনিষ্ট যোগ থাকলেও বিজ্ঞানের অগ্রগতি সভ্যতার মানদণ্ড নয়৷ সভ্যতার মানদণ্ড নির্ভর করে মানুষের উন্নত আচার-আচরণে, ব্যবহারে নৈতিকতায় চারিত্রিক দৃঢ়তায়৷ যা বিজ্ঞানের আবিষৃকত ভোগ্যপণ্য দিয়ে অর্জন করা যায় না৷ তা অর্জন করতে হয় একমাত্র আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে ও উন্নত শিল্প সাহিত্য সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে৷
মানব মনের চাহিদা অসীম অনন্ত৷ পার্থিব কোন দ্রব্য সামগ্রী দিয়ে তা পুরণ করা সম্ভব নয়৷ একমাত্র আধ্যাত্মিক জীবনচর্চাই মানুষের অনন্ত এষণার পূর্ত্তি করবে ও সৎ, নিয়মনিষ্ঠ ও পবিত্র জীবন যাপনে উৎসাহিত করবে৷ সেই সঙ্গে সমাজের সুচিতা রক্ষা করবে,সমাজ কলুষমুক্ত হবে৷ তাই মানব সমাজকে আজকের এই ভ্রষ্টাচার থেকে রক্ষা করতে দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জনের কথাই শেষ কথা--- ‘মানব সমাজের সার্বিক প্রগতি তথা উন্নতির জন্যে সভ্যতা ও বিজ্ঞান উভয়কে একই সঙ্গে প্রোৎসাহিত করতে হবে৷’’ তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন আদালতের অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু সামাজিক সুচিতা রক্ষায় সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে হলে আধ্যাত্মিক অনুশীলনও অপরিহার্য৷
- Log in to post comments