এখন আমি সেই আদিবাসী গ্রামের মাটির গন্ধমাখা ধুলোবালি থেকে বহু দূরে, তুষারশুভ্র হিমালয়ের কোলে এক নির্জন আলয়ে বাস করি৷ আপেলের বাগিচায় ঘেরা এক গৃহের ছোট্ট কোণের ঘরটিই আজ আমার আপন ভুবন, আমার পরম আশ্রয়৷ সেখানেই আমি থাকি, পড়ি, লিখি, ভাবি, আর অনাগত দিনের স্বপ্ণগুলোকে নিঃশব্দে রচনা করি৷
ব্যালকনিতে বসে যখন রঙিন পাখিদের আকাশ ছুঁয়ে উড়ে যেতে দেখি, মনে হয় ওরাই যেন আমার শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের সঞ্চিত আবেগের দূত৷ ওদের ডানায় ভর করেই আমি আমার অতীতের সব সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, অপমান-অভিমান, প্রেম-প্রত্যাশা, জীবনের টানাপোড়েন আর অহমিকাগুলোকে উড়িয়ে দিই সামনের সেই মহিমান্বিত পর্বতশিখরের দিকে৷ সেখানে গিয়ে যেন সব স্মৃতি আলো হয়ে মিশে যায় পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ পাইন বনে, তাদের গায়ে জড়িয়ে থাকা বিমূর্ত শিল্পের মতো মেঘের অলৌকিক ভাঁজে৷
আজ প্রায় ভুলেই গেছি সেই আদিবাসী গ্রামের ছোট্ট মাটির ঘরটির কথা৷ অথচ ওই ঘরই ছিল আমার সোনালি শৈশবের প্রথম পাঠশালা, প্রথম স্বপ্ণের ঠিকানা৷ আমার বাবা জীবনের উপার্জন, প্রিয় সম্পর্ক আর অসংখ্য ব্যর্থতার যন্ত্রণা বুকের ভেতর পাথর করে সেই মাটির বাড়িটি গড়ে তুলেছিলেন৷ দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর অনিশ্চয়তার কঠিন দিনগুলোতে মা ছিলেন তাঁর ছায়ার মতো অবিচল সঙ্গিনী৷ আজ হিমালয়ের শীতল বাতাসে বসেও আমি সেই দিনগুলোর উত্তাপ অনুভব করি, যেন এখনও সেই মাটির উঠোনে গ্রীষ্মের তীব্র রোদের আগুন ঝলসে উঠছে৷
বাবার সেই লড়াইয়ের দিনগুলোতেই আমরা ছিটকে গিয়েছিলাম শহরের ইট-কাঠ-পাথরের ধূসর অরণ্যে৷ সেখানে ভোররাতের স্তব্ধতা ভেঙে ট্রামের ঘণ্টাধবনি ঘুম ভাঙাত৷ যতই চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকতে চাই, উপায় ছিল না প্রতিবেশীর কয়লার উনুনের ঝাঁঝালো ধোঁয়া আমাদের বিছানা ছাড়তে বাধ্য করত৷ শহরের সকাল শুরু হতো ধোঁয়া, শব্দ আর নানা ব্যস্ততার এক নিয়মিত আবর্তে৷
তবু সেই দমবন্ধ শহরে আমার বেঁচে থাকার একমাত্র জানলা ছিল স্কুলের দীর্ঘ গরমের ছুটি, কিংবা বার্ষিক পরীক্ষার পর গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাওয়া৷ শহরের যান্ত্রিক ক্লান্তির মাঝে ওই মাটির ঘরটিই ছিল আমার মুক্ত আকাশ, শ্বাস নেওয়ার পরম সবুজ প্রান্তর৷
শহরের সেই বাড়িতেই কেটেছে আমাদের কৈশোরের জোয়ারভাটা৷ কত প্রতিবেশী, কত বন্ধু, যারা প্রয়োজনে আন্তরিকতায় হয়ে উঠেছিল রক্তের সম্পর্কেরও অধিক আপন৷ দূর গ্রাম কিংবা অন্য শহর থেকে আসা কত চেনা-অচেনা আত্মীয়, কত অতিথি, কত বন্ধুর প্রয়োজনে জ্যাঠা-ঠাকুমার দরজা সর্বদা থাকত উন্মুক্ত৷ সেই বাড়ির অলিন্দে বসেই বড় জ্যাঠার মুখে শুনতাম বরিশালের তাঁর বাল্যকালের কৌতুক, দুঃসাহস আর স্বাধীনতার স্বপ্ণে বিভোর দিনগুলোর গল্প৷ তিনি শোনাতেন ব্রিটিশ কারাগারে তাঁর বন্দী দিনগুলোর বীরগাথা৷ আমি শিহরিত হতাম, বুকের ভেতর অজানা আগুন জ্বলে উঠত৷
অন্যদিকে গ্রামের বাড়িটি ছিল এক অনাবিল আনন্দমেলা৷ লাল মাটির পথে পা ধুলোয় মাখা, কোনো বাঁধন না মানা কৈশোরের রঙিন ছন্দ সেখানে ছড়িয়ে দিত বর্ণময় ছটা৷ প্রতিটি গাছগাছলিতে, প্রতিটি লাল মাটির পথে, প্রতিটি দিনের আলোয় ছড়িয়ে থাকত মুক্তির অপার আনন্দ৷ নিজেদের গরুর খাঁটি দুধ, বাগানের টাটকা সবজি, ভাগচাষীদের মমতায় দেওয়া ঝুড়ি ভরা ফল৷ জঙ্গল থেকে কুল, তেঁতুল, আতা, জাম আর কত নাম না জানা টক-মিষ্টি ফলের টানে আমরা সারাদিন গ্রামের নানা স্থানে ছুটে বেড়াতাম৷ পা-মাথা ধুলোয় মাখা, গায়ে রোদের পরশ, পুকুরে বা জোড়ে অর্থাৎ গ্রামের সেই ছোট সরু নদীতে স্নান করে মনে অবাধ আনন্দের পসরা সাজাতাম৷
ওদিকে শহরের বাড়িতে ছিল শৃঙ্খলার ছাপ৷ সকালের তাড়াহুড়ো, পড়াশোনা সেরে স্নান করে খেয়ে স্কুলে যাওয়া, বিকেলে ক্লাব বা লাইব্রেরি, সন্ধ্যায় ভাইদের সঙ্গে পড়তে বসার ছলে লুকিয়ে নানা কৌতুক আর ফিসফাস৷ ঘরের বাইরে অলিন্দে জ্যাঠা বসাতেন সান্ধ্য আড্ডা৷ সেখানে রাজনীতি, খেলাধুলা, সমাজব্যবস্থা, দেশ-বিদেশের খবর নিয়ে আলোচনা চলত৷ আমি পড়ার বদলে ভেতরে বসে শুনতাম, আর অজান্তেই মন সমৃদ্ধ হয়ে উঠত৷
গ্রামের সেই মাটির বাড়ির প্রতিবেশীরা ছিল শহরের প্রতিবেশীদের তুলনায় সহজ-সরল সাঁওতাল আদিবাসী৷ তাদের উৎসব, নাচ, ঢোল, বাঁশির সুর, আগুনের আলোয় রাতের উল্লাস আমাদের ডাকত৷ আমন্ত্রণের অপেক্ষা থাকত না শৈশবের দুরন্ত কৌতূহলে আমরাও মিশে যেতাম তাদের আনন্দধারায়৷
শহরের বাড়িতে সেই কৌতূহল মিটত লাইব্রেরির বইয়ের পাতায়, স্কুলের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের স্নেহমাখা শাসনে৷ আমার জীবনবোধ গড়ে উঠছিল সেই রকমারি চলচ্চিত্রের মতো বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতায়৷ সেই শহরের বাড়িতেই আমি প্রথম চিনেছিলাম রোগ, মৃত্যু, এমনকি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতাকেও৷ যুদ্ধের গুমোট সময়, সমাজের অসামাজিক ব্যবস্থা আর মানুষের নিষ্ঠুরতা আমার কিশোর মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল৷
দিন চলতে থাকল৷ আমরা ভাইবোনেরা বড় হতে থাকলাম৷ আমাদের জীবনের বটবৃক্ষেরা, অর্থাৎ জ্যাঠা, পিসি, বাবা-মা, ধীরে ধীরে বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকে পড়লেন৷ অনেকেই মহাকালের নিয়মে পাড়ি দিয়েছেন সেই অচিন দেশে৷
আজ সেই পুরনো বাড়িগুলোতে কেউ নেই৷ চেনা পাড়ায় আর কোনো পরিচিত মুখ চোখে পড়ে না৷ সবাই কোথায় মিলিয়ে গেল, কে জানে!
ওই দুই বাড়ির উঠোন, সিঁড়ি, অলিন্দ, চাতাল, বিস্তীর্ণ ছাদ সব আজ নিঃশব্দ স্মৃতিসৌধ৷ যেন জীবননাট্যের ধুলো জমা ডায়েরির পুরনো পাতা হয়ে পড়ে আছে৷ কয়েক বছর আগেও আমি মাঝেমধ্যে সেই বাড়ি দুটিতে যেতাম, সেই দিনগুলোকে স্মরণ করতে৷ বয়স যত বাড়ে, আমরা যেন ততই নিঃস্ব হই৷
কিন্তু দিনগুলোকে তো কোনো মায়াজালে আটকে রাখা যায় না৷ বয়স যত বাড়ে, আমরা তত হারাই, তত হারিয়ে ফেলি সবাইকে৷
আজ আমার সামনে বিস্তীর্ণ পাহাড়, তার গায়ে পাইন ও অন্যান্য গাছে সবুজ বিশাল ক্যানভাস, উপত্যকাগুলিতে ছোট ছোট গ্রাম, দিবারাত্রি বেজে চলে বিপাশা নদীর স্রোতের আর যোগিনী ঝর্ণার কলতান৷ বর্তমান প্রতিবেশী বলতে রঙিন পাখিরা, কিছু বুনো আর গৃহপালিত জীবজন্তু, আর সহজ-সরল পরিশ্রমী পাহাড়ি মানুষগুলো৷
সঙ্গে আছে আমার মনের গোপন ভুবন৷ আছে কল্পনার এক সুন্দর সমাজব্যবস্থা৷ আছে আমার একান্ত আধ্যাত্মিক জগৎ, যেখানে এখনও আলো জ্বলে৷ বুকে এক পৃথিবী স্মৃতির কবর বয়ে আমি এখনও বেঁচে আছি৷ নিঃশব্দে অপেক্ষা করছি সেই অন্তিম যাত্রার, যেদিন আমিও একদিন পাড়ি দেব সেই অজানা, অচিন দেশের বাঁশির সুরের খোঁজে৷
- Log in to post comments