পল, অনুপল, সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, মাস বর্ষ--- কালের এই মানসিক পরিমাপ থেকে দুঃস্বপ্ণের একটি বছর পার হয়ে গেল৷ বাঙালীর দুয়ারে নতুন ভোরের আলো এলো দুঃস্বপ্ণ নিয়েই৷ কালের নিয়মে প্রকৃতি বাঁধা পড়ে না৷ বিধাতার নিয়মে নতুন পুরোনো বলে কিছু নেই৷ সে চির নতুন, চির পুরাতন৷ মানুষের মানসিক পরিমাপের প্রথম দিনের সূর্য সেইভাবেই উদয় হলো প্রতিদিন যেভাবে উদয় হয়৷ সেখানে কোন আবেগ, উচ্ছ্বাস নেই, বর্ষ বরণের কোন আয়োজন নেই৷ প্রকৃতির বুকে কত প্রলঙ্কর কাণ্ড ঘটে, কত ঝড়-ঝঞ্ঝা উল্কাপাত, কত প্লাবন, ভূমিকম্প মহামারী--- প্রকৃতির বিধানে কোন পরিবর্তন আসে না, সেখানে কোন লক্ডাউন নেই, সূর্যটা ঠিক সময়ে প্রকৃতির বুকে আলো ছড়িয়ে উদয় হয়, ঠিক সময়ে অস্ত যায়৷
এই যে নববর্ষ ১লা জানুয়ারীর পরিমাপে---পৃথিবীর সব দেশে সর্বজন গোষ্ঠীর এটাই নববর্ষ নয়৷ বাঙালীরও দিন মাস সালের হিসাবে নববর্ষ আসে শীতের আমেজ নিয়ে নয়, বৈশাখের খরতাপ নিয়ে৷ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তাচলে গেছে৷ কিন্তু তার হিসেবের নববর্ষের প্রভাব থেকে মুক্ত হয় নে দেশ৷ তাই দেশজুড়ে মহাসমারোহে বর্ষবরণের উৎসব মাতোয়ারা৷ এস আই আরের আতঙ্ক, অশুভ সাম্প্রদায়ীক শক্তির দৌরাত্ম, গণতন্ত্রের বেদীতে স্বৈরাচারী শাসকের দাম্ভিক আচরনে দুঃস্বপ্ণের একটি বছর পার করে বর্ষবরণেও দুঃস্বপ্ণের আতঙ্ক এপারে ওপারেও৷ সাম্প্রদায়িক বর্বরতায় আক্রান্ত মানুষ দুঃসহ যাতনায় মরছে৷
মানুষের মানসিক পরিবর্তনের নববর্ষ সমভাবে আলো ছড়িয়ে গেল এপারে ওপারে দুইপারেই৷ কিন্তু বাঙালীর জীবনে রাতের অন্ধকার সরিয়ে নব প্রভাতের আগমণ এত সহজে হবে কী? সাম্প্রদায়ীক বিভাজন, রাজনৈতিক হানাহানি, স্পর্দ্ধিত মিথ্যা, স্বার্থ-লোভ, শক্তির দম্ভে বিদ্বেষ বিষে জর্জরিত সংকীর্ণ ভেদ-বুদ্ধি নিয়ে পাপের পঙ্কিল আবর্তে বাঙালীর ৭৮টা বছর পার হয়ে গেল৷
দলে দলে গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে , সম্প্রদায় সম্প্রদায় শক্তির সর্বনাশা প্রতাপ অহরহ বিভাজনের বীজ বপন করে চলেছে৷ বাঙালী নিজের ভালোটা কবে বুঝবে! বহু বছর আগে কিশোর সুভাষচন্দ্র তাঁর মাকে এক পত্রে লিখেছিলেন---‘মা বাঙালী কি কোন দিন মানুষ হবে না?’ না, বাঙালী আজও মানুষ হলো না৷ বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, রাষ্ট্রে, সমাজে রাজনৈতিক দলাদলিতে, সাম্প্রদায়ীক হানাহানিতে শক্তির অসংযত ব্যবহারে নববর্ষের প্রভাতও অন্ধকারে আচ্ছন্ন৷
বাঙালীর জীবনে সার্থক নববর্ষ সেইদিন আসবে যেদিন সে সব ভেদ-বিদ্বেষ ভুলে শাসকের শোষকের চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে পারবে, অন্ধ জাতি বিদ্বেষে শক্তির অবক্ষয় না করে শক্তির সংযত ব্যবহার শিখবে, মনুষ্যত্ব অর্জনের সাধনায় রত হবে৷
নববর্ষের পুন্যপ্রভাতে জাত-পাত-সম্প্রদায়ের বিভেদ ভুলে বাঙালীর সম্মিলিত প্রার্থনা হোক দার্শনিক ঋষি পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার রচিত প্রভাত সঙ্গীতের প্রেরণায়---
বৎসর নব বৎসর তুমি
কল্যাণ এনো চারিদিকে (তুমি)
নূতন ভোরের হাতছানিতে
নূতন ঊষার নবালোকে৷
বৃক্ষ-লতারা সবুজে ভরুক
বন্য পশুরা নিরাপদ হোক
পাখীরা কণ্ঠে অমিয় ভরিয়া
উড়িয়া বেড়াক দিকে দিকে৷
মানুষে মানুষে ভেদ দূর হোক
বুদ্ধির অপচয় রোধ হোক
শক্তির সর্বনাশা প্রতাপ
সংযত হোক সব দিকে৷
- Log in to post comments