১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে৷ যদিও এই স্বাধীনতাকে সার্বিক স্বাধীনতা বলা যায় না৷ বলা চলে এদিন আমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেছি৷ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আমরা পাই নি৷ ব্রিটিশ শাসকের হাত থেকে শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ভারতীয়দের হাতে এলেও বহুজাতিক পুঁজিপতি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নাগপাশ থেকে ভারতের জনগণ মুক্তি লাভ করে নি৷
যাইহোক এর পর আমাদের নিজস্ব সংবিধান রচনার জন্যে ডাঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে যে কমিটি গড়া হয়, ওই কমিটির দ্বারা রচিত সংবিধান ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারী আনুষ্ঠানিক ভাবে কার্যকরী করার কথা ঘোষণা করা হয়৷ এই নোতুন সংবিধান অনুসারে ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে’ মহাসমারোহে ভারত গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (সাধারণতন্ত্র) প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হয়৷ গণতন্ত্র বলতে বোঝায় যেখানে সরকার জনগণের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত হচ্ছে, আর প্রজাতন্ত্র হ’ল যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন৷ যেমন এদেশের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি ভারতের জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত হচ্ছেন অর্থাৎ পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারাই নির্বাচিত হচ্ছেন৷ ইংল্যাণ্ডের সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অর্থাৎ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হলেও দেশের সাংবিধানিক প্রধান অর্থাৎ এখানকার রাজা বা রাণী জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না৷ তাই ইংল্যাণ্ডে গণতন্ত্র রয়েছে, কিন্তু তা প্রজাতান্ত্রিক নয়৷ আমেরিকা গণতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিকও, তবে এখানে রাষ্ট্রপ্রধানই জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত৷
যাইহোক, ভারতে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র স্বীকৃত হয়েছে৷ কিন্তু মূল কথা হ’ল ওখানে এই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে জনসাধারণকে সংবিধানগতভাবে যে মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে কার্যতঃ আইনের মারপ্যাঁচে সে অধিকার থেকে জনগণ বঞ্চিত৷ যেমন ভারতের সংবিধানে প্রতিটি মানুষের জীবন ও সম্পত্তির অধিকার রয়েছে৷ এটা মৌলিক অধিকার রূপে স্বীকৃত৷ কিন্তু বাস্তবে এদেশে অনাহারে, অপুষ্টিতে মরতে হয় হাজার হাজার মানুষকে৷ এই প্রবল শীতে শীতবস্ত্রের অভাবে শতাধিক মানুষকে কুঁকড়ে মরতে হয়েছে৷ সরকার পুঁজিপতিদের স্বার্থে গরীবের জমি কেড়ে নিচ্ছে৷ যা সিঙ্গুরে হয়েছে, রাজারহাটে হয়েছে৷ নন্দীগ্রামেও যা নিয়ে এত আন্দোলন, যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেককেই প্রাণ দিতে হ’ল পুলিশ ও শাসক দলের হার্মাদদের গুলিতে৷ আজও প্রতিদিন কত নির্দোষ মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে পুলিশ, যৌথবাহিনী বা শাসকদলের জঙ্গী ক্যাডারদের হাতে৷
তাহলে কোথায় গেল প্রতিটি মানুষকে জীবন ও সম্পত্তির মৌলিক অধিকার দানের গালভরা বুলি!
মৌলিক অধিকারগুলির মধ্যে অন্যতম–প্রতিটি মানুষের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অধিকার৷ তাহলে কেন এখনও কোটি কোটি মানুষ অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জমান ব্যষ্টি স্বাধীনতার অধিকার তথা মত–প্রকাশের অধিকারও যদি মৌলিক অধিকার রূপে স্বীকৃত তাহলে কেন শাসক দলের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলে এদেশে জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা থাকে না সংবিধানের বইতে লেখা আছে সাম্য ও ন্যায়ের অধিকার সবাই পাবে৷ কিন্তু এদেশে সত্যই কি এ অধিকার সবাই পায় তা যে পায় না–এটা দিবালোকের মত সত্য৷ প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা ও বঞ্চনার শিকার ভারতীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র৷ বাস্তবে ইংল্যাণ্ডের সংসদীয় গণতন্ত্রের ফটোকপি করে’ ভারতে তাই চালু করা হয়েছে৷ ভারতের নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাবধারাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে ভারতের স্বাধীনতোত্তর নেতৃবৃন্দ পাশ্চাত্ত্যের অন্ধ–নুকরণ করে কাঙিক্ষত ফল লাভ করতে চেয়েছেন৷ ভারতের মনীষীদের–বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, রবীন্দ্রনাথ–এঁদের প্রদর্শিত পথকে দূর থেকে নমস্কার করে’ আমরা অন্য পথে চলেছি৷ নেতাজী সুভাষচন্দ্র এই মনীষীদের আদর্শকে ভারতীয় সমাজে বাস্তবায়িত করতে চেয়েছিলেন৷ সে দিকেও আমরা দৃষ্টি দিই নি৷ নেতাজী যে ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ওপরে ভিত্তি করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন, আমরা সে দিকটাকে একবারও ভেবেই দেখিনি৷
আমাদের নেতারা স্বাধীনতার পরে কেবল একটা কথাই বুঝেছে৷ আর তা হ’ল ভোটের রাজনীতি৷ ক্ষমতা দখলের রাজনীতি৷ যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতা দখল করতে হবে৷ একবার ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারলেই আর কোনো চিন্তা নেই৷ সংবিধান, আইন, আদালত সব কিছুই তখন আত্মস্বার্থ–সিদ্ধির মাধ্যম মাত্র৷ জনগণ তখন গৌণ হয়ে যায়৷
এই পরিস্থিতিতে এই জটিল সংকট থেকে সমাধানকল্পেই মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার দিয়েছেন তাঁর নোতুন দর্শন প্রাউট–যার মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের তথা প্রগতিশীল সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন৷ বলেছেন, সেবা, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিক নৈতিকতায় প্রতিষ্ঠিত মানুষের মাধ্যমে সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সর্বাঙ্গসুন্দর সমাজ গড়ার কথা৷ এটাই যুগের দাবী৷ তাই আসুন, প্রাউটের আদর্শকে জেনে জীবন ও সমাজকে এই নোতুন পথে গড়তে এগিয়ে আসুন৷ এছাড়া আজ আর অন্য কোন পথ নেই৷
- Log in to post comments