১৯৬৯ সালের মাঝামাঝি কোন একটা সময়৷ মেদিনীপুর কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র৷ ঈশ্বর কৃপায় আনন্দমার্গ সংঘটনের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হল৷ জীবনে এলো শুভ দিন৷ আচার্যদেব সাধনা শেখালেন৷ সাধনা শেখানোর পর তিনি বললেন আজ থেকে তোমার পরিচয় তুমি মানুষ৷ তুমি হিন্দু নও, মুসলিম নও, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান নও৷ হিন্দু সমাজের মধ্যে যে সামাজিক জাতিগত বিভাজন আছে যথা--- ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, মাহিষ্য, তন্তুবাই, নমঃশূদ্র, চন্ডাল ইত্যাদি ইত্যাদি--- তোমার পরিচয় তাও নয়৷ তোমার একমাত্র পরিচয় তুমি মানুষ৷ তুমি পরমপুরুষের সন্তান৷ এটাই আনন্দমূর্ত্তিজীর শিক্ষা৷ তাঁর কথা শুণে সেদিন বিস্ময় হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম৷ ভেবেছিলাম এও কি সম্ভব? আনন্দের কথা বর্তমানে এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথমাধের্ব জাত-পাতের ভেদাভেদ অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে৷ তবে একেবারে নিঃশেষ হয়নি৷
১৯৭১ সালের প্রথম দিকে চাকুরী তথা জীবিকার সন্ধানে এদিক-ওদিক ঘুরেছি৷ গুরু কৃপায় একটি হাইস্কুলে যোগদানের সুযোগ পেলাম৷ ইন্টারভিউর সময় শর্ত আরোপ করা হলো উক্ত হাইস্কুলে একটি আদিবাসী ও তপশিলি ছাত্রাবাস আছে৷ যদি যোগ্য বিবেচিত হই, তবে ছাত্রাবাসটি দেখাশুনার পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে৷ শর্ত মেনে নিয়ে বিদ্যালয় যোগদান করব ঠিক করলাম৷ সেই মুহূর্তে অন্য কোন উপায় ছিল না৷ একই পরিবারের সদস্য চাকরিরত অবস্থায় মানব কল্যাণের ব্রত নিয়ে চাকুরীর মায়া ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছেন৷ ফলে সাময়িকভাবে সংসারে অভাব অনটন দেখা দিতে শুরু করেছে৷ সবদিক চিন্তা করে উচ্চতর শিক্ষা লাভের বাসনা ত্যাগ করে সেই মুহূর্তে কর্মী জীবনকেই বেছে নিলাম৷ ছাত্রাবাসটিতে আদিবাসী ও তপশিলি ছাত্ররাই থাকে৷ তাদের অধিকাংশই দরিদ্র অজ্ঞানতার অন্ধকার নিমজ্জিত পিছিয়ে পড়ার সমাজ থেকেই আগত৷ ছাত্রাবাসের মধ্যেই একটি রুম দেয়া হয়েছে থাকার জন্য৷ প্রথম কর্মজীবন উৎসাহ উদ্দীপনার কোন ঘাটতি হয়নি৷ ছাত্রদের পঠন পাঠন থাকা খাওয়ার ব্যাপারে যাতে কোনো অসুবিধে না হয় সে ব্যাপারে সদা সর্বদা লক্ষ্য রেখেছি৷ তবে প্রথম দিনের ঘটনাটা ছিল মনে রাখার মত৷ রাঁধুনী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন--- স্যার আপনি কি আমাদের এই এস.টি হোস্টেলে খাবেন? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম--- এরকম কথা বলছেন কেন? তিনি আমতা আমতা করে বললেন--- এর আগে কোন স্যার এখানে থাকতেন না, এবং এই হোস্টেলে কোন স্যার কোনদিনই খাননি৷ অর্থাৎ হোস্টেল সুপার থাকতেন অন্যত্র এবং আহার করতেন সাধারণ ছাত্রাবাসে৷ সেখান থেকেই আদিবাসী ছাত্রদের দেখাশোনা করতেন৷ এ যেন সেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান শাসন৷ বিদ্যালয়টিতে আরো একটি ছাত্রাবাস ছিল৷ সেখানে সাধারণ ছাত্র ও শিক্ষকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল৷ বিদ্যালয় থেকে আমাকে বলা হয়েছিল আমার পছন্দ মত যে কোন হোস্টেলে আমি আহার-পর্ব সমাধা করতে পারি৷ তবে আমি যেহেতু আনন্দমার্গের আদর্শে অনুপ্রাণিত এবং আদিবাসী হোস্টেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেজন্য নীতিগতভাবে উক্ত ছাত্রাবাসে আহার গ্রহণ করব মনস্থির করেছিলাম৷ ছয় মাস ছাড়া অনুদানপ্রাপ্ত সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি আদিবাসী হোস্টেলে আদিবাসী ও তপশিলি ছাত্রদের সঙ্গে পাশাপাশি বসে একজন শিক্ষক অতি সাধারণ মানের আহার গ্রহণ করছেন এটা সে সময় কেউ কল্পনাও করতে পারেননি৷ ছাত্ররা প্রথম প্রথম একটু দূরে দূরে থাকতো৷ কিন্তু যখন তারা দেখল আমার মধ্যে কোন সংকোচ ভাব নাই, তাদের পাশে বসেই তারা যা খাচ্ছে আমিও তাই খাচ্ছি, তখন তারা আমাকে তাদের আপনজন ভাবতে শুরু করল এবং আমার সঙ্গে গভীরভাবে মিশতে শুরু করল৷ আমি শিক্ষক থেকে তাদের আত্মীয় হলাম৷ তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় বা পঠন-পাঠনের মাঝে বোঝালাম আমরা সবাই পরম পুরুষের সন্তান৷ কেউ ছোট বা কেউ বড় নয়৷ সবার পিতা একজনই৷ একই পিতার সন্তান কখনো ভিন্ন ভিন্ন জাতের হতে পারে না৷ যে জাত পাত মানে সে পরম পিতাকে মানে না৷ যে পরমপিতাকে মানে সে জাত পাত মানবে না৷ আমরা সবাই একই পরিবারের৷
এই ছাত্ররা অনেকেই আনন্দমার্গের আদর্শে উদ্ভুদ্ধ হয়ে সাধনা শিখেছে ও আনন্দমূর্ত্তিজীর ভাবধারা গ্রহণ করে নিজেদের জীবন সার্থক করেছে৷
- Log in to post comments