(১২) একটু আগেই ৰললুম, ‘থুড্’ধাতুর অর্থ ঢেকে রাখা, লুকিয়ে রাখা৷ কোন বস্তুকে খেয়ে ফেললে তাকে ঢেকে রাখা বা লুকিয়ে রাখা হ’ল৷ তাই ইত্যর্থে ভক্ষণ করা অর্থেও ‘থুড + ‘ড’ করে ‘থ’শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷
(১৩) ধবন্যাত্মক ‘থ’থেমে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়৷ প্রাচীনকালে মানুষ যখন ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে তাদের দিয়ে গাড়ী চালাতে শুরু করল তখন তারা ঘোড়াকে চলবার নির্দেশ দিত র-র-র-র-র-র ধবনির দ্বারা৷ আর ঘোড়াকে থামাতে বলত থ-থ-থ-থ-থ-থ ধবনির দ্বারা৷ তাই ‘থ’ধবনিটি থেমে যাওয়ার নির্দেশ বা সংকেত৷ যে গাড়ী ‘র’ধবনিতে চলে ও ‘থ’ ধবনিতে থামে তার নাম রাখা হ’ল ‘রথ’৷
(১৪) ৰাংলা ভাষায় ‘থ’শব্দের অর্থ বিস্ময়-বিমূঢ় হয়ে যাওয়া৷ ‘‘লোকটার কথা শুণে আমি ‘থ’হয়ে গেলুম৷’’
(১৫) একটু আগেই ৰললুম, ‘থ’শব্দ ঔষধার্থে ব্যবহৃত হয়৷ এই ঔষধ যে কেবল শারীরিক রোগের ঔষধ তাই নয়, মানসিক রোগের ঔষধও৷ মানসিক রোগের যতরকম ঔষধ আছে তার একটা হচ্ছে মানুষের মনে রসচেতনা জাগিয়ে তার মনকে হালকা করে দিয়ে ব্যথাভার সরিয়ে দেওয়া চিন্তাক্লিষ্টতা অপনয়ন করা৷ এজন্যে প্রাচীনকালে এক ধরণের মানুষ থাকতেন যাঁরা মানুষের মনকে নানান ভাবে হাসিতে খুশীতে ভরিয়ে রাখতেন৷ মন ভাবে-ভাবনায় আনন্দোচ্ছল হয়ে উপচে পড়ত৷ এই ধরণের মানুষেরা শিক্ষিত বা পণ্ডিত থেকে থাকুন বা না থাকুন এঁরা মানব মনস্তত্ত্বে অবশ্যই পণ্ডিত হতেন৷ এঁদের বলা হত বিদুষক৷ বিদুষকের ভাববাচক বিশেষ্য abstract noun) ‘বৈদষ্য’ শব্দটির সঙ্গে নিশ্চয়ই তোমরা ভালভাবেই পরিচিত৷
‘‘বাক্বৈখরী শব্দঝরী শাস্ত্রব্যাখ্যানকৌশল
বৈদষ্যং বিদুষাং তদ্বৎ ভুক্তয়ে ন তু মুক্তয়ে৷৷’’
তাই ‘থ’ শব্দের একটি মানে হ’ল বিদুষক৷ বিদুষককে বর্তমান বাংলায় ‘ভাঁড়’ৰলা হয়৷ তবে বিদূষক অর্থে ‘ভাঁড়’ শব্দটি ৰেশী পুরোনো নয়৷ ভণ্ড ও ‘ভাণ্ড’ দু’টি শব্দেরই তাদ্ভবিক রূপ ‘ভাঁড়’৷ ভণ্ড মানে কপটাচারী hypocrite) যার ভাববাচক বিশেষ্য রূপ ‘ভণ্ডামি’ (ভাঁড়ামি---hyocricy) আর ‘ভাণ্ড’ শব্দের ভাবারূঢ়ার্থ হচ্ছে আধার, যোগারূঢ়ার্থে কোন বস্তু রাখবার পাত্র অথবা সুখের পসরা৷ ‘ভাণ্ড’শব্দের এই দ্বিতীয় অর্থ থেকেই বিদূষকের জন্যে বাংলায় ‘ভাঁড়’শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে৷ অনেকে মনে করেন ৰাঙলার সুপ্রসিদ্ধ বিদূষক গোপাল ভাঁড়ের আসল নাম গোপাল চন্দ্র ভাণ্ডারী ছিল ৰলেই সেই ‘ভাণ্ডারী’ থেকেই ‘ভাঁড়’ শব্দ এসেছে৷ না, জিনিসটা তা নয়৷ ‘ভাণ্ডার’ শব্দের কথ্য বাংলা ‘ভাঁড়ার’আর ‘ভাণ্ডারী’ থেকে ‘ভাঁড়ারী’৷ তাই ‘ভাঁড়ারী’ থেকে ‘ভাঁড়’আসতে পারে না৷
প্রাচীনকালে যজ্ঞি-বাড়ীতে ভাণ্ডারের দায়িত্ব নিতেন এক ধরণের শুদ্ধাচারী কায়স্থেরা অথবা নাপিতেরা৷ তাঁদের ‘ভাণ্ডারী’ৰলা হত৷ সেই থেকেই কায়স্থ ও নাপিতে ভাণ্ডারী পদবীটা আজও চলে আসছে৷ গোপাল ভাঁড়ের পদবী ছিল ‘ভাণ্ডারী’৷ সেটা তিনি ‘ভাঁড়’ হিসেবে নন, পদবী হিসেৰে৷ (শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকারের লঘুনিরক্ত থেকে সংগৃহীত)