কংগ্রেস ১৯৪৫ সালে সেপ্ঢেম্বরে অন্তর্বর্তীকালিন মন্ত্রিসভা গঠন করে জহরলালকে সামনে রেখে৷ অক্টোবর মাসে মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভায় যোগ দেয়৷
ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন জায়গায় আজাদহিন্দ বন্ধিদের বন্ধি করে রাখার ব্যবস্থা করল৷ সেই জন্য ব্যারাক বানিয়ে *ব্যারাকপুর-বারাসাত রোডের নীলগঞ্জের* হাতের কাছে কয়েক হাজার বন্ধি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷
*১৯৪৫ সালের সেই দিনটি ছিল ২৫ সেপ্ঢেম্বর৷* মধ্যরাত পেরিয়েছে সবে৷ নীলগঞ্জের ডেরায় একটা খাঁচায় বন্দি প্রায় তিন হাজার আইএনএ বাহিনীর সৈন্য৷ একদিন ভারতকে স্বাধীন করার জন্য তাঁরা লড়েছিলেন৷ নেতা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু৷ তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না৷ কিন্তু স্বাধীনতার লক্ষ্য তো মিথ্যা হতে পারে না৷ হঠাৎ, ব্রিটিশ পুলিশ এসে হাজির৷ সঙ্গে কয়েকজন অফিসারও৷ এরপর কী হল, সেইটার বিস্তারিত বিবরণ আজ পাওয়া যায় না৷ শুধু সেই সময় আশেপাশের অঞ্চলে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা রাতদুপুরে শুনতে পান একটানা গুলির আওয়াজ৷ প্রায় গোটা রাত গুলি চলেছিল নীলগঞ্জের ওই ডেরায়৷ কাদের ওপর, সেটা আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হয় না৷ রাতারাতি আইএনএ’র ওই তিন হাজার সৈন্যকে ঠান্ডা করে ব্রিটিশ পুলিশ৷ কোল্ড-ব্লাডেড জেনোসাইড!
পরেরদিন যখন বাসিন্দারা ওখানে যান, সেখানকার দৃশ্য দেখে শিহরিত হন সবাই৷ পাশেই বয়ে যাচ্ছিল নোয়াই খাল৷ রং বদলে খালের জল হয়ে গেছে লাল! চারিদিকে ধোঁয়া সঙ্গে পোড়া গন্ধ৷ মানুষ পোড়ার৷ এখানে সেখানে পড়ে আছে আইএনএ’র বন্দি সৈনিকদের ছিন্নভিন্ন দেহ৷ এক জায়গায় মাটি খোঁড়া হচ্ছে, সব দেহ একসঙ্গে সেখানে চাপা দেওয়া হবে৷ মিটিয়ে দেওয়া হবে এই নারকীয় ঘটনার সমস্ত নিদর্শন৷
এত বড়ো একটা ঘটনা, অথচ ইতিহাসে তার বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না৷ ১৯৪৫-এরই অক্টোবরে অমৃতবাজার পত্রিকায় এই ঘটনার বিবরণ হিসেবে বলা হয় ‘মাত্র পাঁচজন’ আইএনএ সৈন্য মারা গেছেন৷ তিন হাজারের জায়গায় পাঁচ! তার থেকেও বড়ো কথা, ভারত সরকারের তরফ থেকেও পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরেও এই ঘটনা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করা হয়নি৷ কেন এরকম ধামাচাপা? আজাদ হিন্দ বাহিনী ভারতের ইতিহাসে একটি চিরস্মরণীয় নাম৷ তাঁদের একটা বড়ো অংশকে রাতদুপুরে স্রেফ ‘খুন’ করা হল৷ অথচ, আজকের ইতিহাস বই চুপ!
সেই স্থান বর্তমানে আজও অবহেলিত হয়ে আছে কোনো আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের রক্ত মাখা মাটি কাঁদে নিরবে৷
এই ঘটনাকে পাঞ্জাবের *জালিয়ানাবাগ থেকেও পৈশাচিক ঘটনা* বলা যেতে পারে৷ পরের দিন চারিদিকে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল৷ কিন্তু ব্রিটিশ সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে ঢোকার অনুমতি দিল না৷ চারিদিকে পুলিশের ব্যারিকেট বসল৷ আর সংবাদপত্রে সরকার প্রচার করলো নিজেদের মধ্যে বিদ্রোহ করে সৈন্যরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে৷ সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা কংগ্রেস নেতা গান্ধীজি সহ সব নেতারাই এই ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করলেন না৷ এখানে খেয়াল রাখতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের প্রধান হিসেবে জওহরলাল নেহেরুও কোনো মন্তব্য করলেন না৷ এই নিয়ে তখন খুব শোরগোল পড়েগেল৷ বেশ কিছুদিন পর জওহরলালের মন্তব্য *’আমি শুনেছিলাম ওই প্রকার একটি ঘটনায় মাত্র ৫ জন সৈন্য মারা গেছেন’*৷ সত্যি শুধু বিচিত্র দেশ নয়, বিচিত্রতম দেশই বলা যেতে পারা যায়৷ আর রাজনীতি ! এতেই বোঝা যায় বহু আগে থেকেই কংগ্রেস নেতাদের ব্যক্তিস্বার্থ বা দলের স্বার্থ ছাড়া কিছুই তাদের নজরে আসত না৷ বর্তমানে সব রাজনৈতিক দলের একই মতাদর্শ৷ সেই ট্রেডিশন সমানে চলছে৷
- Log in to post comments