চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য, উচ্চ সেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর৷
উল্লিখিত পংক্তিদ্বয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থের ‘প্রার্থনা’ শীর্ষক কবিতা থেকে সঙ্কলিত৷
‘নৈবেদ্য’ মানে ঈশ্বরের প্রতি নিবেদিত৷ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ মূলতঃ আধ্যাত্মিক চিন্তাধারায় আপ্লুত৷ অর্থাৎ এই কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি কবিতায় পরমপুরুষের কৃপাধন্যতার উল্লেখ পরিলক্ষিত হয়৷ উল্লিখিত পংক্তিদ্বয়ের মাধ্যমে কবি পরমপিতাকে প্রার্থনা জানিয়েছেন যে, তিনি যেন মানুষের মনে মানবতা বোধ তীব্র করার জন্য তাঁদের মন থেকে ‘ভয়’ নামক জিনিষটি মুছে দেন৷ কারণ ‘ভয়’ হচ্ছে -- প্রগতির বাধক বৃত্তি৷ যাদের মনে ভয় আশ্রয় করে, তাঁরা কোন শুভকাজে হস্তক্ষেপ করার সাহস করে না৷ কারণ ‘ভয়’ হচ্ছে -- আদর্শ প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় শত্রু৷ আমরা জানি যে, শ্রেষ্ঠ কাজে বাধা আসবেই,বিঘ্ন থাকবেই -- তবুও বাধা-বিপত্তির ভয়কে অগ্রাহ্য করেই উপলসঙ্কুল পথ বেয়ে এগিয়ে যেতেই হবে৷ শ্রী শ্রীমদ্ভদগীতায় শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন -- শ্রেয়াংসি বহু বিঘ্নানি৷ আবার বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে বলা হয়েছে:--
ষড়দোষাঃ পুরুষেণেহ হন্তব্যাঃ ভূতিমিচ্ছতা৷
নিদ্রা-তন্দ্রা, ভয়ং-ক্রোধঃ, আলস্যং দীর্ঘসূত্রতা৷৷
‘ভুতিমিচ্ছতা’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ-- উন্নতি-কামী ব্যষ্টি৷ ভূতি+ইচ্ছতা= ভূতিমিচ্ছতা৷ ভূতিং শব্দের অর্থ-- উন্নতি ওরফে প্রগতি৷ অতএব যাঁরা ব্যষ্টিগত অথবা সমষ্টিগত জীবনে উন্নতি চান তাঁদের জন্য উপরিউক্ত শ্লোকটি কেবল শ্লোক নয়, বরং সঠিক পথে পথ চলার উচিত নির্দেশনা৷ এই শ্লোকটিতে মানব শরীরে শত্রুরূপে অধিষ্ঠিত ছটি বিশেষ ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ এগুলো হলো-- নিদ্রা, তন্দ্রা, ভয়, ক্রোধ, আলস্য ও দীর্ঘসূত্রতা৷
উল্লিখিত ছয়টি দোষের মধ্যে তৃতীয় দোষটি সবচেয়ে বড় শত্রু কারণ এটির অবস্থান আমাদের শরীরস্থ মণিপুর চক্রে৷ মণিপুর চক্র হচ্ছে -- দশটি বৃত্তির অধিষ্ঠান স্থল৷
১৷ লজ্জা ২৷ পিশুনতা ৩৷ ঈর্ষা ৪৷ সুষুপ্তি ৫৷ বিষাদ ৬৷ কষায় ৭৷ তৃষ্ণা ৮৷ মোহ ৯৷ ঘৃণা ও ১০৷ ভয়৷
‘ভয়’ বৃত্তি কেবল মানুষের মধ্যে নয় -- প্রতিটি জীবের মধ্যেই বর্তমান৷ অতএব ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে:--
আহার নিদ্রা ভয় মৈথুনঞ্চ সামান্যমেতৎ পশুভির্নরাণাম
ততো হি একো বিশেষো ধর্র্মে ধর্মেণ হীনাঃ পশুভির্সমানাঃ৷৷
উপরিউক্ত শ্লোকটিতেও ‘ভয়’ শব্দটি তৃতীয় স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে যা পশু ও মানুষের মধ্য সমভাবেই বর্তমান৷ প্রথমতঃ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিটি জীবের জন্য ‘আহার’ অর্থাৎ ভোজন একান্ত প্রয়োজন৷ দ্বিতীয়তঃ ক্লান্তি দূরীকরণার্থে নিদ্রার প্রয়োজন৷ তৃতীয় বৃত্তিটার নাম ‘ভয়’ যা জীবের দুর্বলতা ও সামর্থ্যহীনতার দ্যোতক৷ আর ভয়ের মধ্যে মৃত্যুভয় প্রতিটি জীবকে সর্বাধিক ভীত করে৷ কারণ সবাই বেঁচে থাকতে চায় -- সবাই নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়৷ কিন্তু মানব জীবনে ভয়ের অধিক্ষেত্র অনেক বৃহৎ৷ অতএব বিশ্বকবি আবার বলেছেন --
‘এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে, হে মঙ্গলময়,
দূর করে দাও তুমি, সর্ব তুচ্ছ ভয়,
লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যভয় আর --
দীন প্রাণ দুর্বলের এ পাষাণভার৷’
উপরিউক্ত কবিতাটিতে কবি ‘ভয়’কে অতি তুচ্ছ বলেই অভিহিত করেছেন৷ কিন্তু ভয়াতুরতা এমন একটা ব্যাধি যা প্রশ্রয় পেলে হু হু করে বেড়ে যায়৷ মানুষের মনে যে বৃত্তিসমূহ জড় জাগতিক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় তারা সংখ্যায় পাঁচটি -- আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুন ও ধর্মসাধনা৷ এদের মধ্যে কেবল প্রথম চারটি পশু জীবনকে প্রভাবিত করে৷ আর ধর্মসাধনা একটি বিশেষ বৃত্তি যা মানুষ ব্যতিরেকে অন্য কোন জীবের মধ্যে পরিলক্ষিত নয়৷ কিন্তু এই বৃত্তি গুলোর এমন স্বভাব যে, সামান্য প্রশ্রয় পেলেই এরা হু হু করে বেড়ে যায়৷ সুতরাং এদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা-- প্রতিটি মানুষের পবিত্র কর্তব্য৷ এদেরকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শুরুতে যৎসামান্য কষ্ট হলেও পরে তা স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ জড় জাগতিক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সক্রিয় পাঁচটি বিশেষ বৃত্তি সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ও সত্যদ্রষ্টা ঋষি শ্রী শ্রী আনন্দমূর্তিজী বলেছেন:--
এই বৃত্তিগুলোর মধ্যে প্রথম চারটি মূখ্যতঃ জাগতিক ও গৌণতঃ মানসিক৷ আর পঞ্চমটি সমভাবে জাগতিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক৷ মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার নিমিত্ত সর্বনিম্ন মাত্রায় প্রথম চারটির প্রয়োজন থাকে৷ আর পঞ্চমটি অর্থাৎ ধর্ম ভাবনার প্রয়োজন মানুষের জীবনে কোন মাত্রাবিচার করে না৷ যত বেশি থাকে ততই ভালো৷ প্রথম চারটিকে যদি মানুষ একে অন্যের মধ্যে পরিসঞ্চালন করে দিতে পারে, তাহলে তো আরও ভালো অর্থাৎ সে অবস্থায় তাদের কোন কোনোটির প্রয়োজন একেবারেই থাকবে না৷’
উপরিউক্ত চারটি বৃত্তির মাত্রা যদি বৃদ্ধি পায় তাহলে মানুষের মনে জড়তা আশ্রয় নেয়৷ আর এই জড়তারূপী জঞ্জাল মানুষের জীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখার চেষ্টা করে৷ সুতরাং উপরোক্ত প্রতিটি বৃত্তিকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণাধীনৈ রাখতে হবে৷ মুক্ত জীবন যাপনার্থে, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বৃত্তিসমূহকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের আওতায় বেঁধে রাখতে হবে৷ এই সব জড়তার জঞ্জাল থেকে মুক্তি লাভ অবশ্যই কঠিন তবে অসম্ভব নয়৷ আরেকটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, জড়তাকেন্দ্রিক মনে অবশ্যই ভাবজড়তা আশ্রয় নেয়৷ আর ভাবজড়তা মানুষকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে রাখার চেষ্টা করে৷ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে অত্যধিক মাত্রায় ভয়ের সৃষ্টি হয়৷ সুতরাং এই কুসংস্কার মানুষকে প্রতি পদে ভয়াতুর করে তোলে৷ ফলস্বরূপ আধ্যাত্মিক উন্নতি অবশ্যই ব্যাহত হয়৷ সুতরাং প্রতিটি আধ্যাত্মিক সাধকের মনে রাখা উচিত -- ভয় হচ্ছে জড়তার প্রতীক আর জড়তা হচ্ছে মৃত্যুর অগ্রদূত৷
‘প্রার্থনা’ শীর্ষক কবিতার মাধ্যমে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরমপুরুষের নিকট অনুরোধ জ্ঞাপন করেছেন যে, কোন মানুষ কোনদিন যেন ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ না করে ও অন্যায় ও অসত্যের পদতলে নতমস্তক না হয়৷ অতএব কবিতাটিতে একটা কথা অবশ্যই সুস্পষ্ট যে ন্যায়সঙ্গত জীবন যাপন করাই ধার্মিক ব্যষ্টিদের লক্ষণ৷
ভয়ের কারণ -- দুর্বলতা ও অজ্ঞতা৷ ভয়ের সবচেয়ে বড় কারণ-- ভাবজড়তা৷ সুতরাং ভয়মুক্ত জীবনই আমাদের কাম্য হওয়া উচিত৷ কারণ কবি এটাই চেয়েছেন৷
‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য’-- কবিতাটিতে কবির আত্মসম্মানবোধ সহ সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নিষ্ঠার ভাবনা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পরিস্ফুট৷ তিনি চেয়েছেন -- মন থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দুরীভূত হউক আর সত্যের আলোয় মন আলোকিত হোক৷
কিন্তু মানুষ কেন ভয় পায়? এই সম্বন্ধে জগদগুরু শ্রীশ্রীআনন্দমূর্তিজী বলেছেন --
‘যখন সে দেখে লৌকিক জগতে সে এমন একটা তত্ত্ব বা এমন একটা শক্তির সামনাসামনি হয়ে পড়েছে অথবা নিকট ভবিষ্যতে হয়ে পড়তে পারে, আর তার সামর্থ্য তুলনায় অনেক কম, তখন সে যে বৃত্তির দ্বারা গ্রস্ত হয়, তাকে বলা হয়--‘ভয়’৷ কিন্তু যদি তখন সে ভাবে বা অনুভব করে যে, ব্যষ্টিগত ভাবে তার সামর্থ্য কম হলেও, যার সাহায্য সে পাচ্ছে, সেই সাহায্যকারী শক্তিটা বিরোধী শক্তির চেয়ে অনেক প্রবল, তখন তার আর ভয় থাকে না৷’
দুর্বলতা, অজ্ঞানতা ও ভাবজড়তা হচ্ছে -- ভয়ের মূল কারণ৷ আর ভয় হচ্ছে -- মনুষ্যত্ব বিকাশের পথে দুর্দমনীয় বাধা৷ ভয়ের কারণেই কোন ব্যষ্টির ব্যষ্টিত্ব যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়৷ দীনতার দুর্বলতা, হীনতার হীনমন্যতা, ভয়াতুরতার সঙ্কীর্ণতা মানুষকে ক্রমশঃ ঘন তমসাচ্ছন্ন অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়৷ অতএব উচ্চ শিরে, মুক্ত ও স্বাধীন জীবন যাপন করতে হলে মন থেকে অবশ্যই সকল রকমের ভয়কে পরাজিত করতেই হবে৷ নান্যপন্থা৷ আর এরই সূত্র ধরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন:--
‘যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি,
বিচারের স্রোতোপথ ফেলে নাই গ্রাসি--
পৌরুষের করে নাই শতধা, নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা,
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ
ভারতের সেই স্বর্গে করো জাগরিত৷
- Log in to post comments