একালের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশেই নাগরিক পঞ্জীকরণ (এন.আর.সি) নাগরিকত্ব আইন (সিএএ), ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এস আর আই) ব্যবস্থা চালু রয়েছে৷ ভারতবর্ষে এর অধিক কিছু নয়৷ তবে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের কিছু রাজ্যে ২০২৫--- ২৬ এর বর্তমান এস আই আর নানাকারণে আলোচ্য হয়ে উঠেছে৷ মনে দাগিয়ে দেওয়ার জায়গাটা ধরতে গেলে কিছু আড়ালে ঠেলে দেওয়া বিষয় সামনে তুলে আনা বোধহয় গুরুত্বপূর্ণ৷
সমাজবিজ্ঞানের আধুনিক ভাবনায় প্রকাশ যে মানুষের জীবনে সার্বিক কল্যাণমুখী একটা সর্বানুস্যূত সমাজব্যবস্থা থাকা দরকার৷ সমাজের ব্যবস্থাপনা-নিয়ম-কানুন তৈরী হবে প্রকৃতির নিয়মকে মান্যতা দিয়ে (দ্য ল অবনেচার -এর ওপর দাঁড়িয়ে) এটাকে হতে হবে যৌক্তিকতা ভিত্তিক বিচারশীল ও বিজ্ঞানসম্মত৷ এজন্য একটা সূত্র তথা সত্যকে মূলধন করা যেতেই পারে৷ তাহলে সমাজজীবনে মানুষের চলাটা হয় মসৃণ ও সহজ৷ কিন্তু কি সেই সত্য-সূত্র? আনন্দমার্গ দর্শনের সামাজিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব প্রাউটে বর্জিত সূত্রটা হচ্ছে আঞ্চলিকতার পথ ধরেই বিশ্বের আঙিনায় উত্তরণ’’ (রিজিওনাল ইনএ্যাপ্রোচ ইউনিভার্সাল ইনআউটলুক)৷ বৈবহারিক জীবনে এর প্রয়োগ ও প্রয়াস তথা নিত্যপ্রয়াসটা হচ্ছে বাইরের জগতের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চলতে অসীমের পানে চলা৷ ‘‘মানিয়ে চলা’’ (এ্যাডজাস্টমেণ্ট) সন্তুলন - খাপ - খাওয়ানো) কথাটা ছোট্ট ও বহুল প্রচলিত তবে তা গভীরচারী এবং স্থান কাল, পাত্র সাপেক্ষ৷ এটা মন-প্রধান জীব মানুষের অজানাও নয়৷ অবশ্য কথাটা জগতে ও জীবনে প্রতিটি প্রাণীন সত্তার ক্ষেত্রেই খাটে৷ বলাবাহুল্য সমাজ জীবনে এমন সমাজ পাওয়ার অধিকারটা অবশ্যই মানুষের জন্মগত, প্রকৃতিদত্ত৷ কিন্তু আজো বাস্তবে তা হয়ে ওঠেনি৷
এখন তো আর মানুষের অজানা নয়, প্রসঙ্গক্রমে আরো মনে রাখা দরকার যে মানুষের আছে আত্মনিয়ন্ত্রন শক্তি বিচারশীলতা ইচ্ছাশক্তি-উইলফোর্স৷ তাই সে চলে বিচার বুদ্ধির আলোয় চালিত-তাড়িত হয়ে৷ কিন্তু মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীরা চলে প্রকৃতিদত্ত সহজাত প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়ে --যা সীমাবদ্ধতায় বাঁধা- সার্কিটের যন্ত্রের মত৷ প্রকৃতিই তাদের সব কিছুর নিয়ন্তা৷ অর্থাৎ পশুর আছে কেবল জীববৃত্তি কিন্তু জীব হিসেবে এই মানুষেরও আছে জীববৃত্তি সঙ্গে অধিকন্তু আছে বুদ্ধিবৃত্তি৷ এখানেই মানুষের সঙ্গে পশুর মৌলিক পার্থক্য৷ এখন প্রশ্ণ হচ্ছে --- অসীমের লক্ষ্যের পানে মানিয়ে চলতে চলতে ‘ছুটে-চলা’’, অর্থাৎ মানুষের পক্ষে বাস্তব জগতের সঙ্গে ’’মানিয়ে-চলা’’র জন্যে মৌলিকতায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বা বিষয় কী ? জগতে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই-এ টিকে থাকতে হলে বা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সন্তুলন বা খাপ খাইয়ে চলতে হলে তিনটে বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ --- জীবিকা, মাতৃভাষা ও আধ্যাত্মিকতা৷ মানুষ আগে বাঁচবে তবেই তো সে চলবে বেঁচে থাকলে তবেই না উদ্বর্তনার প্রশ্ণ! কাজেই জীবনযুদ্ধে আগে বাঁচতে হবে৷ বাঁচতে গেলে চাই ন্যূনতম প্রয়োজন (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা) পূর্ত্তির যথাযথ ব্যবস্থা ও নিশ্চিততা৷ এগুলো পাওয়ার গ্যারান্টি এসে গেলে তার পরেই আসে সর্বাধিক সুখ-সুবিধা পাওয়ার অবস্থা৷ ভৌতিক জগতে এমনকি মনো-জগতে সভ্যতার অগ্রগতি ও ক্রমোন্নতি এর ওপরেই অনেকাংশে নির্ভর করে৷
মানুষ তো মন প্রধান জীব৷ তাই জীবনধারণের জন্যে অবলম্বিত পেশা বা বৃত্তি থাকলে এসে যায় নিজেকে ব্যক্ত করার বা নিজেকে অন্যের কাছে মেলে ধরার বা মনের কথা অর্থাৎ বলার আকুলতা, বুকের ভিতরের ধূমায়িত - গুঞ্জরিত-অনুরণনিত জমে ওঠা-প্রকাশ করা উদ্ভূত ভাবের শাব্দিক অভিব্যক্তি৷ অর্থাৎ আগে অস্তিত্ব রক্ষা তারপর ব্যাপ্তি---অভিপ্রকাশ৷ ভাব প্রকাশের এইযে মাধ্যম একে এক কথায় বলা হয় ভাষা৷ মনের ভাব ব্যাক্ত করার সহজ, স্বচ্ছন্দ সাবলীল ও স্বতস্ফূর্ত মাধ্যম হচ্ছে মাটির ভাষা--মাতৃভাষা৷ কেননা মানুষের স্বাভাবিক, অনায়াস, আপনা হ’’তে বেরিয়ে আসা - স্বতস্ফূর্ত অভিপ্রকাশটা অবশ্যই প্রকৃতির দান, নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ফসল৷ ভাব ভাষায় রূপ নেওয়ার আগে পর্যন্ত পৃথিবীর সব ভাষা উৎস মূলে এক ও অভিন্ন৷ কণ্ঠ থেকে বাইরে বার হবার সময়ই তা ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে পালটে যায়৷ ভাব প্রকাশের সময় অন্য অঞ্চলের ভাষার আগল দিলে বিকাশের স্বাভাবিক পথটাও বন্ধ হয়ে যায়৷ আবার তা নানা ক্ষেত্রে শোষণ-বঞ্চনার বীজ বপন করে৷ সে কারণে মানুষের সমাজজীবনে মাতৃভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷
কথায় বলে, নুন না দিলে তরকারিতে স্বাদ হয়না৷ এমনকি রোগপ্রতিরোধে পুষ্টিতে স্বাস্থ্য রক্ষায় হজমে ব্যঘাত ঘটে৷ সেই রকম আধ্যাত্মিকতা বিহীন মানুষের জীবনটাও অর্থহীন, পানসে, পশুর সমান৷ মানুষ তার বিশেষ জৈববৈজ্ঞানিক যন্ত্র রূপ শরীরটা পেয়েছেই আধ্যাত্মিকতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যেই৷ মানুষের আন্তর প্রকাশ মর্মধবনির নামটাই আধ্যাত্মিকতা (সাইলেন্ট ইনহেরিটেন্স) গুরুত্বপুর্ণ এই বিষয় তিনিটি থেকে ঊঠে আসে যে মানুষ ত্রয়ী সত্তা বিশিষ্ট জীব৷ শরীর-মন-আত্মাকে জড়িয়েই মানুষ৷ আর এই তিনের সমান্তরাল বিকাশেই মানুষের সার্বিক কল্যাণ৷ সার্বিক বিকাশের পরিবেশ পেতে বস্তুজগতের সঙ্গে’’ মানিয়ে-চলাটা মানুষের একটা বড় জৈবধর্ম আবার প্রকৃতিজাত স্বভাব গুণও বটে৷ এই জৈবধর্ম প্রকৃতিগত স্বভাব বৈশিষ্ট গড়ে দেয় মানুষের আবির্ভাবের প্রাকৃতিক তথা ভৌগোলিক অধ্যাত্ম বিজ্ঞান অনুসারে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ কোথায় জন্মাবে আর জন্মায় পূর্ব জন্মের অর্জিত সংস্কার (প্রোটেশিয়ালএনার্জি) অনুযায়ী৷ সহজ সত্যটা হ’ল বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি মানুষই কোন না কোন জনগোষ্ঠী ভুক্ত (এথনিকগ্রুপের)৷ আবার প্রতিটি জনগোষ্ঠীই এক একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে উঠে আসা৷ এই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের ভিতরের ও বাইরের প্রকৃতিই মানুষের চেহারায় দেগে দেয় স্বতন্ত্র আদল, মুখে বসায় স্বতন্ত্র ভাষা চলার পথে বইয়ে দেয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি, যোগায় গ্রাসাচ্ছদনের রসদ, স্বতন্ত্র প্রাণধর্ম আরোপ করে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের সীলমোহর দিয়ে দেয়৷ এই ভাবে পৃথিবীর বুকে প্রায় ২৫৪টি বিশিষ্ট জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে৷ সে কারণে মানুষের সমাজ জীবনে ভৌগোলিক অঞ্চলের অবস্থান ও ভৌগোলিক প্রকৃতি এত গুরুত্বপূর্ণ৷ কিন্তু এই আঞ্চলিক অবস্থান সব সময়, সবক্ষেত্রে, সব জায়গায় সব মানুষের পক্ষে নিরাপদ হয়নি ৷ কেননা আপেক্ষিক জগতের সব কিছুই আপেক্ষিকতার অধীন৷ জনসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে৷ জীবিকা অর্জনের উপায় ও রসদগুলো সীমাহীন নয়, চিরকালীনও নয়৷ যুগে যুগে মানুষের রুচি ও চাহিদা পালটেছে৷ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ও ক্রমোন্নতি মানুষের জীবনধারায় পরিবর্তন এনেছে৷ সংঘর্ষ - সমিতির মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে (ক্ল্যাশ এণ্ড কোহেশন) অনেক কিছুই অধিকার করেছে আবার হারিয়েছেও৷ উদ্ভাবন, প্রাকৃত দ্রব্যকে ব্যবহার্য দ্রব্যে রূপান্তরের কৌশল রপ্ত করা, প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের খাদ্য নিজে তৈরী করা ও নিত্য প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা অর্জন মানুষকে স্থায়ীভাবে বাসিন্দা বানালেও নিরঙ্কুশ নির্ভরতা দেয়নি৷ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন, বাঁচার রসদে ঘাটতি- অভাব-সীমাবদ্ধতা -যোগান শেষ হয়ে আসা নিরাপত্তার অভাব রাষ্ট্র বিপ্লব, যুদ্ধবিগ্রহ বহিরাগতদের নির্মম আধিপত্য ইত্যাদি মানুষকে স্বস্তি দেয়নি৷ আদিম মানুষ নানা প্রয়োজনে নানা পরিস্থিতির চাপে পড়ে আশ্রয়- বসত ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছে৷ প্রাগৈতিহাসিক কাল ঐতিহাসিক কাল থেকে একই ঘটনা ঘটেছে৷ এমনকি একালেও বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগেও বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অনেকটা কম হলেও যাযাবরি পর্যাবৃত্তি মানুষকে ছেড়ে যায় নি৷ বস্তুতঃ যাযাবরতা বা যাযাবরী-পর্যাবৃত্তি খোঁজে ফেরা ( অনুসন্ধিৎসু) মানুষের প্রকৃতিগত আদিম প্রবণতা৷ মহেঞ্জোদাড়ো --- হরাপ্পার সভ্যতা তথা সিন্ধুসভ্যতার আঞ্চলিক মানুষও স্থায়িত্ব পায়নি৷ জীবনে নিত্য প্রয়োজনের রসদের খোঁজে নিরাপত্তার অভাবে অভাবে সাধের এলাকা ছেড়ে অনুকুল অঞ্চলে পাড়ি দিয়ে ছিল একই ভাবে৷ মিশরে নীলনদের সভ্যতা মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা, আমেরিকার মায়া সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা আটলান্টিসের অস্তিত্ব প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রেই এলাকা ছেড়ে মানুষের চলে যাওয়া ও আসা বা হারিয়ে যাওয়া ঘটেছে৷ বঙ্গমহাভূমির সমুন্নত গঙ্গারিডি সভ্যতার মত কোনোটির অতীত হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে আবার নোতুন করে গড়ে উঠেছে নব্য বঙ্গের জনজীবনের মত৷ এখন তো অস্তিত্ব রক্ষা তথা কোনক্রমে বেঁচে থাকার আশায় বা আধুনিক সর্বাধিক সুখ সুবিধার প্রত্যাশায় কিংবা অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করতে কোথাও উড়ছে টাকা ধরতে মানুষ তো চলছেই৷ পৃথিবীর বুকে মানুষের আবির্ভাবের সময় থেকে ( প্রায় দশ লক্ষ বছর আগে থেকে) আজো এ চলার বিরাম নেই৷ কর্মসূত্রে স্থানান্তরণনও ঘটছে আকছাড়৷ দেশ ভ্রমণের নেশায়ও ছুটছে মানুষ, তবে ভ্রমণ ক্ষেত্রে গেঁড়ে বসতে নয়, নোতুনকে জানতে, নোতুনকে চিনতে সৌন্দর্য পিপাসা মেটাতে৷ এই চলাচল যেমন বিশ্ব জুড়ে তেমনি নিজেদের ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যেও৷ আধুনিক সচেতন রাষ্ট্র ব্যবস্থা কখনো মানবিকতার খাতিরে কখনো নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে কখনো বা পরিস্থতির চাপে এই পরিযায়ী পর্যাবৃত্তি ও যাযাবরতার সমস্যা মনে করলেও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না৷ কিন্তু কেন? ব্যাপারস্যাপার দেখে মনে হয় যাযাবরী স্বভাবটা যেন প্রকৃতিই বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্য সিদ্ধি করতে মানুষের জীনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে৷ মানুষের যাযাবরী স্বভাবের ফলাফল পরখ করলে সেটাই মান্যতা পায়৷
যাযাবর স্বভাবের দুটি প্রতিফল লক্ষ্য করা যায়৷ যাযাবর বৃত্তি এক সময় মানুষকে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার রসদ যোগাড়ে সহায়ক হয়েছে ঘাত-প্রতিঘাতের আবহ যোজনা করে সংশ্লেষণের পথ তৈরী করে দিয়েছে যা মানব সভ্যতার বিকাশে সহায়ক হয়েছে৷ যাযাবর বনাম স্থানীয় অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের দখলদারী ও নিজভূমি রক্ষার লড়াইয়ে ও পারস্পরিক মেলামেশা -ভাবের আদান-প্রদানে সভ্যতার ও মানব মনের অগ্রগতি হয়েছে, পুষ্ট হয়েছেও ভাষা সংস্কৃতি৷ নোতুন নোতুন সভ্যতার উন্মেষ হয়েছে৷ এই স্বভাবের ফলশ্রুতিতে উদ্ভব হয়েছে নরগোষ্ঠীর ( রেসের ), রেগুলোর মিলনে এলো জনগোষ্ঠী (এথনিকগ্রুপ), উন্মেষ হলো জাতিসত্তার (এথনিসিটি )৷ বলাবাহুল্য ব্রিটেন সহ ইউরোপের অনেক দেশ দুই আমেরিকা, ভারতবর্ষ প্রভৃতি অনেক দেশই ভাগ্যান্বেষী তথা আধিপত্যবাদী মানুষের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সংঘর্ষ- সমিতি ভাঙাগড়া মেলামেশার মধ্য দিয়ে আধুনিক পর্যায়ে এসেছে৷ হয়তো বহুকে এক করার প্রকৃতিরই ইপ্সা ও মাধ্যম বা কৌশল দুই-ই৷ হয়তো এটা মানব জাতিকে এক সূত্রে গাঁথতে প্রকৃতিরই দীর্ঘমেয়াদী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা৷ তাই হয়তো বিশ্বের আধুনিক বড়-ধনী-উন্নত-শক্তিশালী দেশগুলো চাইলেও এর থেকে রেহাই পাচ্ছে না৷ যাযাবর বৃত্তি বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে৷ সেই যাযাবরতা আজ শরণার্থী অভিবাসী, পরিযায়ী সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী৷
ভোল বদল করে মানুষকে প্রকৃতির খেয়ালী খেলার ইতিবাচক দিক যেমন আছে তেমনি আজকের পৃথিবীর তা কতগুলো উৎকট সমস্যার মধ্যে এনে ফেলেছে৷ মানুষের সমাজ ছিন্নমূলতা - বৈষম্য - শোষণ - বঞ্চনা - দমন-পীড়ন-অত্যাচার-অবিচার -এর শিকার হয়েছে , হচ্ছে৷ সমস্যাটার মৌলিক তথা জটিল ব্যাপারটা হচ্ছে আজকের পরিভাষায় তা স্থানীয়- বহিরাগত-তত্ত্ব৷ মানে --স্থানীয় অঞ্চলে বহিরাগতদের সংখ্যা বৃদ্ধি স্থানীয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রন কায়েম করা আধিপত্য বিস্তার করতে স্থানীয় ভাষার ওপর নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দেয়া অপসংস্কৃতি ঢুকিয়ে দেয়া অর্থের বহিঃস্রোত ঘটানো স্থানীয় মানুষকে নিজভূমে পরবাসী করা৷ ফলে ভূমিপূত্ররাই যেন নিজেদের হাজার হাজার বছরের বাসভূমিতে বিদেশী চলছে বিদেশী খেদা --- যেমন বাঙলায় ঘটছে৷ স্থানীয় অঞ্চলকে এক অদ্ভূত বিপন্নতা গ্রাস করছে৷ বহু অঞ্চলের জনবিন্যাসটাই পালটে গেছে, যাচ্ছে৷ অনেক ক্ষেত্রে কারা যে আদি বাসিন্দা আর কারা যে বহিরাগত বোঝাই দায় হয়ে পড়ে৷ কিছু দিন পর বহিরাগতরাই ভূমিপুত্র বলে আওয়াজ তোলে৷ কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যসে সেই একই’/---সুরে খেদোক্তি দেখিতে পাইলাম যাযাবর আর্যগণ উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ অতিক্রম করিয়া স্রোতের মত অনার্য্য-আদিমজাতি -শাসিত প্রাচীন ভারতে প্রবেশ করিতেছেন ভারতের পরবর্তী যা কিছু ইতিহাস----এই আর্যসভ্যতার ইতিহাস---বিজিত অনার্য্য জাতিদের ইতিহাস কোথাও লেখা নাই কিংবা সে লেখা আছে এই সব গুপ্ত গিরিগুহায় অরণ্যানীর অন্ধকারে চূর্ণমান অস্থিকঙ্কালের রেখায়৷ সে লিপির পাঠোদ্ধার করিতে বিজয়ী আর্যজাতি কখনও ব্যস্ত হয় নাই৷ আজও বিজিত হতভাগ্য আদিম জাতিগণ তেমনই অবহেলিত অবমানিত উপেক্ষিত৷ সভ্যতাদর্পী আর্যগণ তাহাদের দিকে কখনও ফিরিয়া চাহে নাই, তাহাদের বুঝিবার চেষ্টা করে নাই, আজও করে না৷’ (বিভূতিভূষণ উপন্যাস সমগ্র ৫৭২৷) এইরকম রেড ইণ্ডিয়ান, ইহুদি কুর্দ বাঙালী জনগোষ্ঠীর মত নিজভূম থেকে উৎখাত ও ইতিহাস-বিস্মৃত হওয়ার নজীর বিশ্বজুড়েই অনেকই রয়েছে৷ (চলবে)
- Log in to post comments