এ যাবৎ পৃথিবীতে যত প্রকার রাষ্ট্রপরিচালন ব্যবস্থা আছে তার মধ্যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সর্বৎকৃষ্ট না হলেও মন্দের ভালো৷ অর্থাৎ রাষ্ট্রের কল্যাণে গ্রহণযোগ্য বিকল্প ব্যবস্থা না আসা পর্যন্ত৷ গণতন্ত্র সম্পর্কে বলা হয়ে যাকে জনগণের দ্বারা জনগণের জন্যে জনগণের সরকার৷ কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করে জনগণের সংখ্যা গরিষ্ঠের সামাজিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতনতা ও গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের ওপর৷ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার এই চারটি প্রধান স্তম্ভ হলো আইনসভা, শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যম৷ গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সার্থকতা নির্ভর করে এই চারটি স্তম্ভের যথার্থ ও নিরপেক্ষ আচরণের ওপর৷
আইন সভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠ দলই রাষ্ট্র পরিচালনার কর্ণধার৷ কিন্তু ভারতবর্ষের মতো বহুদলীয় গণতান্ত্রিক দেশে কখনই প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না৷ দেশের মোট ভোটারের ৩৫-৪০ শতাংশ বোট পেয়েও নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যায় গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার ঘটন করে৷ কিন্তু সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চেতনা না থাকায় অসৎ ব্যষ্টিরা নির্বাচিত হয়ে শাসন ক্ষমতা দখল করে৷ তারপর সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে এমন সব আইন পাশ করায় যা জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থি ও শাসকদল ও ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষা করে৷ একইভাবে বিচার বিভাগ প্রশাসন, গণমাধ্যম সবগুলিকেই শাসক দল নিজের অধীনে নিয়ে নেয় সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করতে৷ ক্ষমতার জোরে ওই সব জায়গায় দলীয় বশংবদদের প্রধান পদে বসিয়ে দেয়৷ তাই গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রকৃত জন কল্যাণের কাজে ব্যবহার করতে হলে গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভকেই স্বতন্ত্র, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন থাকা উচিত৷
স্বাধীন ভারত দীর্ঘদিন একটি দলের শাসনাধীনে থাকায় গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলিতে দলীয় আধিপত্য থাকলেও মানুষ সুবিচার পেত, গণমাধ্যমগুলির অধিকাংশই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারতো৷ ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার সময়টা বাদ দিলে প্রশাসন গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ অনেকটাই স্বাধীনভাবে চলতে পারতো৷ কিন্তু নরেন মোদি ক্ষমতায় আসার পর গণতান্ত্রিক পদমর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে সংসদে একপ্রকার সংখ্যা গরিষ্ঠতার মাস্তানি দেখিয়ে আইন পরিবর্তন করে দেশে জরুরী অবস্থার চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরী করেছেন৷ এক দেশ, এক ভাষা, এক আইন, এক ধর্মমতের রাষ্ট্র গড়ার প্রবণতায়.. ডেমোক্রেসি দানবতন্ত্রে পরিণত হয়েছে বলা যায়৷
ভারতীয় গণতন্ত্রকে ভারতীয় পশ্চিমী সংস্কৃতি স্বাধীনতার অনেক পূর্বেই কলঙ্কিত করেছে৷ ১৯৩৯ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচনে মহাত্মা গান্ধীর পছন্দের প্রার্থী সীতারামাইায়াকে পরাজিত করে সুভাষচন্দ্র জয়ী হন৷ অহিংসার পূজারী তার মননীত প্রার্থীর পরাজয় মেনে নিতে পারেনি৷ গান্ধী ও তার অনুগামীদের ফ্যাসিষ্ট আচরণের ফলে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতির পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ সংখ্যা গরিষ্ঠের দ্বারা নির্বাচিত সভাপতি হয়েও তিনি কাজ করতে পারেন নি৷ এমন কি সেদিন গান্ধী ভক্তরা গান্ধীকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে গান্ধীর নামে জয়ধবনি দিয়েছিলেন৷ সেদিন থেকেই ভারতীয় গণতন্ত্রের বেদীতে ফ্যাসিষ্টের হুংকার শুরু হয়েছে৷
নরেন মোদি ক্ষমতায় আসার পর বিচার বিভাগ থেকে প্রশাসন গণ-মাধ্যমকে দলীয় কবজায় আনতে আইন পরিবর্তন করছে, নতুন আইন বলবৎ করছে৷ সেই পথেই নির্বাচন কমিশনের মাথায় বসেছে এক দলীয় বশংবদ৷ অবিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে এস.আই.আরের নামে চরম স্বেচ্ছাচারিতা করছে নির্বাচন কমিশনার বিচার ব্যবস্থা থেকে গণমাধ্যমের এক বৃহৎ অংশকে দলীয় বশংবদে পরিণত করে বিরোধীদের পিষে মারতে চাইছে নরেন মোদি৷ ওই একই ভূমি থেকে উঠে আসা ফ্যাসিষ্ট শক্তি জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচিত সভাপতি সুভাষচন্দ্রকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল৷ ওই ভূমিরই ফ্যাসিষ্ট শক্তি আজ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারের ওপর ফ্যাসিষ্ট আক্রমণ হানছে বার বার নির্বাচনে পরাজিত হয়ে৷ আর্থিক বঞ্চনাতো রয়েইছে৷ বিভিন্ন এজেন্সি দিয়ে হুংকার তো চলছেই৷ এবার দলীয় বশংবদ নির্বাচন কমিশনার দিয়ে বাঙালী জনগোষ্ঠীকেই অবলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র৷
ফ্যাসিষ্ট শক্তির স্মরণে রাখা দরকার গণতন্ত্রের বেদীতে বসে নির্বাচিত সরকারের ওপর এই ঔদ্ধত্ব আস্ফালন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অশুভ ইঙ্গিত৷ সাম্প্রদায়িক ও ভাষিক সন্ত্রাসে এই উপমহাদেশে অনেক ভাঙাগড়া হয়েছে৷ এবার ফ্যাসিষ্ট স্বৈরাচার গণতন্ত্রের সৌধে বসে সাম্প্রদায়িক ও জাতিক বিদ্বেষের বিষ ছড়াচ্ছে৷ যার পরিণতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কল্যাণকর নয়৷
- Log in to post comments