প্রভাতী

লেখক
নিউটন বিশ্বাস

মায়ার বাঁধন কাঁদে, মৃত্যু নদী খেয়া পারাপারে

জীবনের ভেলাখানি ভাসে দুঃখ বেদনার তীরে

সাধন সঞ্চয় কেবা ধরে রাখে কামনার ভীড়ে,

নিত্যব্রত শুদ্ধ সাধনার বেদী থাকে একধারে৷

নিয়তির দাসখত লিখে রাখে সব ইতিহাস

কোন পাপ-পুণ্যে জন্ম-মৃত্যু গঙ্গাপুত্র কুন্তী-কর্ণ

অবিনশ্বর আত্মার মূর্ত্তি নিয়ত বিভক্ত বর্ণ

যুক্তিহীন মুক্তির মহিমা জীবনে ক্রীতদাস৷

কলঙ্কের কালিঘাটে ঊলুধবনি পিতৃহীন রাধা

পরাশর বীর্য্যে বেদব্যাস অন্ধ সাধনে গান্ধারী

কুরুক্ষেত্রে শরশয্যা মায়াজাল রেখেছে বিস্তারি.....

জন্মান্তরের বেদনা কোন অচেনা শিকলে বাঁধা

বেদান্তের ইতিকথা সনাতন সাধনার বেদী

জাতিশ্বর ঈশ্বর আমি এসেছি স্বর্গ-মর্ত্য ভেদি৷

লেখক
রামদাস বিশ্বাস

আমার গানের সুরে নীল–নীলিমায় দূরে

তোমার গীতির ধারা বয়ে যায়৷

তোমার প্রেমের স্রোতে অনন্ত এই পথে

আমার জীবন যায় ভেসে যায়৷৷

গান শোণাতে বাজাও বাঁশী

মধুর চেয়েও মিষ্টি হাসি

হাসো তুমি কাছে–দূরে বিশ্বভূবন ঘুরে ঘুরে

দোলাও হৃদয় মধুর দ্যোতনায়৷৷

তোমায় আমি ভালবাসি

ভালবাসি ভালবাসি

আমার মুখে তোমার ভাষা আমার বুকে তোমার আশা

আমার আশা যাচি গো তোমায়৷৷

 

লেখক
শ্রী রবীন্দ্রনাথ সেন

আমি তো রোজ স্বপ্ণ দেখি নতুন ভোরের

আমি তো রোজ স্বপ্ণ দেখি নতুন দিনের

অমানিশার অবসানে এসেছে নতুন ঊষা

দেখেছি তিমির বিনাশী নতুন দিশা

উদার আকাশে বিহঙ্গরা মেলে পাখা

মুক্ত বাতাসে দোলে সবুজের শাখা৷

দেখি পৃথিবীর সাজিখানি ভরা নানা ফুলে

কাঞ্চন কেয়া কুন্দ কুমুদ কমলে

সুষ্ঠু সবল সুন্দর সতেজ প্রতি দল

সুরভিত সুশোভিত হাসে অনুপল

শ্যামল সুন্দর মধুর ধরাতল৷

মানুষে মানুষে নেই বিভেদ ঘৃণা–বিদ্বেষ

জ্ঞানের আলোয় ভরা মুক্ত বুদ্ধির এক দেশ৷

শোষণ বঞ্চনা নেই,

নেই নিদারুণ যন্ত্রণা অনাহার

আধি ব্যাধি হয়েছে শেষ, শেষ দম্ভ অহংকার৷

গুণী পায় মান, ঋষি পায় সম্মান

কর্ষক শ্রমিক সবারই সমান অধিকার৷

তীব্র কটাক্ষ চক্ষে তবু মৃদু হাসি হেসে,

ভৈরব বেশে কারা যেন দাঁড়িয়েছে এসে৷

আর দেরী নয় ঃ তাই অবশেষে

ভালবেসে সবে পাশাপাশি বসে

ভাগ করে পান করে মধু

ধরণীর মধুভাণ্ড হতে৷

লেখক
সুরঞ্জন সরকার

দেশ বরেণ্য মহামান্য গুণে গরীয়ান

দেশের জন্য নানাদিকে আছে যাঁদের দান৷

বীর বাঙালী বঙ্গসেনা বালক ক্ষুদিরাম,

ভারতবাসী কেউ কখনো ভুলবেনা তাঁর নাম৷

বিনয়–বাদল–দীনেশ সবাই অগ্রগণ্য,

দেশের জন্য জীবন দিয়ে এঁরাই হলেন ধন্য৷

মাষ্টারদা সূর্যসেন আর তীতু–মাতঙ্গিনী,

আজও এঁদের ত্যাগের কথা ভুলতে পারিনি৷

গান্ধী–সুভাষ–অরবিন্দ্,

স্বাধীনতার জন্য এঁরা সব ছিলেন তৎপর৷

রফিক–শফিক–সালাম মিলে,

ভাষার জন্য জীবন দিয়ে স্বর্গে গেলেন চলে৷

বঙ্গবন্ধু–বীরেন্দ্র আর রাজীব–ভারতমাতা,

সন্ত্রাসীদের শিকার হলেন এসব মহান নেতা৷

বিদ্যাসাগর–রামমোহ রায় আর বিবেকানন্দ,

দেশের সেবায় এক হলেন সব ভুলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব৷

জগদীশ বসু–প্রফুল্ল রায়–সত্যেন–সি. ভি. রামন,

বিজ্ঞানের সেবক এঁরা, করি এঁদের স্মরণ৷

মধুসূদন–বঙ্কিমচন্দ্র,

এঁরা সবার মনের মাঝে নিত্যই করেন বাস৷

জীবনানন্দ–সুকান্ত আর দিজেন্দ্র–নজরুল,

এঁদের কথা রাখতে মনে কেউ করেনা ভুল৷

রজনীকান্ত–সত্যেন্দ্র্,

ছন্দে–গানে বিশ্বে এঁদের জুড়ি মেলা ভার৷

মীর মশারফ–জসীমুদ্দিন,

সবাই এঁরা ক’রে গেছেন সাহিত্যেরই সেবা

নোবেল জয়ী কবিগুরুর প্রণাম জানাই পায়,

এমনি আরও কত মহান আছেন দুনিয়ায়৷

কীর্তি যাঁদের, তাঁরাই তো পান হৃদয় মাঝে ঠাঁই,

শ্রেষ্ঠ যাঁরা সৃষ্টি মাঝে, তাঁদেরই গুণ গাই৷

লেখক
জিজ্ঞাসু

আকাশ কত বড়! মন বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ধরা পড়েছে , সাধারণভাবে মানুষের চেতন মনের পরিসর যত বড়, তার তুলনায় অনেক অনেক গুণ বড় হল অবচেতন মনের সীমানা!! শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, বিজ্ঞান জগতে যা কিছু নোতুন আবিষ্কার তার উৎস স্থল, মানবের অবচেতন মন! চেতন মনকে দেখা যায় না কিন্তু মন খারাপ বা ভয় পাওয়া বা রেগে যাওয়া বা খুশীর মুড---এই অবস্থা অনুভব করার পর মানুষ মনকে স্বীকার করে নেয়৷ পরের প্রশ্ণ, দেহের মধ্যে মন থাকে কোথায় কিভাবে? মনের নেটওয়ার্ক দেহের ভিতর প্রতি পরমাণু অতিপরমাণুতে পরিব্যপ্ত৷ রক্তমাংস, হাড় চামড়া থেকে শ্বাসক্রিয়া, প্রতি প্রতঙ্গে থাকা জীবন্ত দেহকোষে ‘মন’ থাকে , যেভাবে জলের মধ্যে বাতাস থাকে, ইথার থাকে৷ যেখানে দেহের কাজ চলছে মানে মন আছে ৷ চুল বা নখের বেড়ে ওঠা থেকে হজম বা বর্জন প্রণালী বা শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধের কারবার বা চিন্তার জগৎ সর্বত্র সবকিছু জুড়ে আছে মন৷ গভীর প্রশান্তির অবস্থায় ‘‘মন’’ থাকে না থাকার মতোই৷ তখন বলি মগ্ণ বা তন্ময় হয়ে থাকা৷ আবার অত্যন্ত অশান্তি র অবস্থায়, ক্রোধ, লোভ, প্রতিহিংসা পরায়ণতা ,ঝগড়া তর্কের অবস্থা ভয় বা গভীর কামাবেগে দেহের মধ্যেকার রসায়ণে নেগেটিভ পরিবর্তন আসে, হার্টবিট্ পালস্ বিট এ দ্রুতি আসে, ক্লান্তি আসে, বিষাদ আসে, হতাশা আসে যা প্রশান্তির অবস্থায় থাকে না৷ অতএব দেহের ওপর মনের প্রভাব অপরিসীম৷ পরের প্রশ্ণ মন কত সূক্ষ্ম? ওই যে শব্দ বহন করে যে আকাশ, সেই আকাশ বা শূন্য স্থান থেকেও অধিকতর সূক্ষ্ম অবস্থা হল মানবমন৷ এর অর্থ যেখানেই আকাশ আছে তার ভেতরে মনও আছে৷ এখন বিজ্ঞানের যন্ত্রে ধরা পড়েছে শুধু শ্বাস প্রশ্বাস নয়, প্লাজমা, রক্ত,হরমোন, ভিটামিন, প্রোটিন থেকে চামড়া, চুল,চোখ, দাঁত, হাড় সর্বত্র আকাশই আকাশ! দেহের মধ্যে থাকা আকাশেক ক্ষেত্রগুলিকে মিলিয়ে নিলে, জানা যাচ্ছে, মানবদেহের ৯৯.৯৯ অংশই মহাকাশে পূর্ণ৷ তাহলে মন আমাদের আরো কত বড়!

বানর মহা–সভায় হট্টগোল

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

বুদ্ধিবৃত্তিতে বানর কিছুটা মানুষের কাছাকাছি বরং মানুষের মধ্যে এমন কিছু কিছু উন–মানস আছে যাদের বুদ্ধি বানরের চেয়েও কম, তাদের জন্যে সাধারণ পুরুষ বাক্য ‘বানর’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়৷ ‘‘দেখতে মানুষের মত কিন্তু বুদ্ধি বানরের মত–যা যা আর বাঁদরামি করতে হবে না৷’’ কিন্তু বুদ্ধির উৎকর্ষ যাই হোক না কেন, বাঁদর বস্ত্র পরিধান করে না, যদিও  তারা জল ও আগুনের পার্থক্য বোঝে৷ এই জন্যে ‘কীশ’ শব্দের অন্যতম যোগারূঢ়ার্থ হচ্ছে বাঁদর৷

‘ক’ অর্থে জল৷ জলের ঈশ–এই  অর্থে ‘কীশ’ শব্দটি প্রাচীনকালে ব্যবহৃত হত৷ ভাবারূঢ়ার্থে ‘কীশ’ বলতে বোঝায় জলের স্বভাব ও গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে যিনি সম্যক্রূপে অবহিত আছেন৷

‘কীশ’ বলতে গিয়ে একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ল৷

আমাদের শহরে থাকতেন একজন মুখুজ্জে মশাই৷ তিনি যখন বর্দ্ধমান জেলায় তাঁর স্বগ্রামে থাকতেন তখন সন্ধ্যের সময় গ্রামশুদ্ধ লোক তাঁর বাড়ীতে জড়ো হত ও তাঁকে ঘিরে বসে গল্প শুণত৷ তিনি যখন জীবিকা সূত্রে আমাদের শহরে আসতেন তখন দেখা যেত–শহরের না হোক, পাড়ার অধিকাংশ লোকই তাঁকে ঘিরে রয়েছে আর বলছে–মুখুজ্জে মশাই, গপ্প বলুন......চাই গপ্প.....আরও গপ্প.......রঙিন গপ্প......মজাদার গপ্প৷

মুখুজ্জে মশাই মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, সভ্য–ভদ্র ও শাদা–সিধে৷ কোন ব্যাপারে কারও মনে কোন জটিল প্রশ্ণ দেখা দিলে লোকে তা মুখুজ্জে মশাইয়ের গোচরীভূত করত মুখুজ্জে মশাই উত্তর দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করতেন৷

একবার আমার অতি পরিচিত সুবোধ গাঙ্গুলী মুখুজ্জে মশাইকে জিজ্ঞেস করলেন–‘‘হ্যাঁ মুখুজ্জে মশাই, বাঁদররা আপনি বলেন খুবই বুদ্ধিমান৷ তবে তারা আমাদের মত প্যান্ট–শার্ট পরে না কেন?’’

মুখুজ্জে মশাই বললেন–‘‘এটা একটা জটিল প্রশ্ণ৷ এর সঙ্গে সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক প্রগতি তিনই নিহিত রয়েছে৷ তাই উত্তরটা একটু ভেবে বলতে হবে’’৷

পরদিন সন্ধ্যেয় মুখুজ্জে মশায়ের মুখ ভার.......মন খারাপ .......কপালে দুশ্চিন্তার বলিরেখা৷

সবাই বললে–‘‘কী ব্যাপার মুখুজ্জে মশাই, কী হয়েছে’’

মুখুজ্জে মশাই বললেন–‘‘দেখনা আমার সব হাসি–গপ্প আজকের রেডিও–সমাচার অঙ্কুরে বিনষ্ট করে দিয়েছে’’৷

সুবোধ বললে–‘‘ভেবেছিলুম, আজকে আপনি আমার প্রশ্ণটার উত্তর দেবেন৷ তা আজকের সন্ধ্যেয় কী আপনি বারান্দায় বসবেন না’’

মুখুজ্জে মশাই বললেন–‘‘না, আজ আমার মানসিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়৷ আমাদের মত অল্প বেতনের সরকারী কর্মচারীর ওপরেও মহামান্য সরকার বাহাদুর ইনকাম ট্যাক্স (আয়কর) ধার্য করবেন৷ আজ আমার পক্ষে বৈঠকে আসা সম্ভব নয়৷ ১৫৷২০ মিনিট অপেবা করে দেখো, যদি গেলুম তো গেলুম, নইলে বুঝবে আমি শুয়ে পড়েছি’’৷

মুখুজ্জে মশাইয়ের শ্রোতৃবর্গ তাঁর প্রতীবায় তীর্থের কাকের মত হা–পিত্যেশে আকাশের পানে চেয়ে বসে রইল মিনিটের পর মিনিট৷ কিন্তু কই, মুখুজ্জে মশাইয়ের পদধ্বনি তো শোণা যায় না’’৷

হঠাৎ মুখুজ্জে  মশাইয়ের পদধ্বনি......৷ শান্ত সংযত ভাবলেশহীন মুখ৷ মুখুজ্জে মশাইয়ের মুখে দুশ্চিন্তার বলিরেখা অন্তর্হিত৷ মুখুজ্জে মশাই দৃৃতার সঙ্গে বললেন ‘‘ইউরেকা........ইউরেকা.......পেয়েছি....... পেয়েছি’’৷

সবাই সমস্বরে বললে–কী পেয়েছেন মুখুজ্জে মশাই কী পেয়েছেন বলুন .......বলুন৷

মুখুজ্জে মশাই বললেন–‘‘তবে শোণো, কতকগুলো গোপন কথা ......অতিগুহ্য তত্ত্বকথা......৷

কিছুদিন পূর্বে কিস্কিন্ধ্যানগরে নিখিল বিশ্ব বানর মহাসভার অধিবেশন হয়েছিল৷ তাতে উপস্থিত জ্ঞানী–গুণীরা অনেকেই বললেন–‘‘সভ্যতার প্রগতির সঙ্গে আমাদেরও তাল মিলিয়ে চলতে হবে৷ সেই কোন সুপ্রাচীন যুগ থেকে বানরদের ‘কীশ’ বলা হয়ে আসছে৷ ‘কীশ’ শব্দের মানে যাদের জ্ঞান–বুদ্ধি সবই আছে, কেবল প্যান্ট–কোট পরে না৷ আজকের পরিবর্ত্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের প্যান্ট–কোট পরা উচিত কিনা এ নিয়ে গভীরভাবে ভাববার দিন এসেছে৷

অধিবেশনে বানর–মহাসভার অনেক তাগড়া তাগড়া এম–পি–ও উপস্থিত ছিলেন৷ তাঁরা বললেন–এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে এখানে বসে সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভাল৷ বরং বিষয়টি জনমত সংগ্রহের জন্যে প্রেরণ করা হোক–আর একটি শক্তিশালী কমিশন নিয়োগ করা হোক৷

সকলেই সমস্বরে বললে–পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডে কোন বৃক্ষে কোন বানর প্রকাশ্যে বা গোপনে বসবাস করছে তা ধরবার উপায় নেই আবার সব গোষ্ঠীর বানরের ভাষা সব বানরেরা ভালভাবে বোঝে না কারণ বানরদের গোষ্ঠীগতভাবে ভাষা–ভেদ আছে৷ কোন লিপিও নেই..... কোন লিখিত সাহিত্যও নেই ........ গোটা একটিও সংবাদপত্র নেই৷ তাই জনমত সংগ্রহের মাধ্যমগুলো বানরদের মধ্যে বিশেষ কাজ দিতে পারে না৷ এ অবস্থায় একটি শক্তিশালী কমিশন নিয়োগ করলে ভাল কাজ হবে৷

একটি শক্তিশালী কমিশন নিয়োগ করা হ’ল, আর ঠিক করা হ’ল কমিশনের রায় সর্বজনগ্রাহ্য বলে বিবেচিত হবে৷

যথাকালে কমিশনের রায় বেরুল৷

কমিশন বানরদের জন্যে একটি বিশেষ ধরণের থ্রী–কোয়ার্টারস্ প্যান্টের (না–হাফ, না–ফুল)– বিধান দিলেন যাতে পায়ের ফাঁক দিয়ে ন্যাজটি সহজেই বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে৷ গায়ে থাকবে এক ধরণের নাইলনের জামা যা গাছের ডালে ছিঁড়বে না, কাঁটা ক্ষিঁধলেও ফেঁসে যাবে না৷ কমিশনের রায় বেরোবার কিছুদিন পরে বানর মহাসভার আবার একটি অধিবেশন বসল৷ অধিবেশনে কর্মকর্ত্তারা বললেন–কমিশনের রায় গ্রহণযোগ্য অবশ্যই কিন্তু মাঝখানে একটি বিপদ হয়ে গেছে৷ কমিশনের রায় বেরোবার পর সমাজ–উন্নয়ন দপ্তরের ফালতু মিনিষ্টার (উপমন্ত্রী) মহোদয় বিশ্বের একটি বিশ্বস্ত মাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন৷ প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ইউনিবার্স্যাল ট্রেডার্স্ কোম্পানী আনলিমিটেড অর্থাৎ এঁরা বিশ্বের সমস্ত দেশেই অসীমিতভাবেই তৈরী–পোষাক সরবরাহ করে থাকেন ও করবেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফালতু মিনিষ্টারের সঙ্গে পোষাক প্রতিষ্ঠানের মতভেদ দেখা দিল৷

ফালতু মিনিষ্টার বললেন– আপনাদের পোষাক গোটা বিশ্বের সমগ্র বানর সমাজই পরিধান করবে৷ সুতরাং আপনাদের লাভ হবে অঢেল৷ এজন্যে আমাকে অন্ততঃ দশ লাখ টাকা সেলামী দিতে হবে’৷

পোষাক–প্রতিষ্ঠান বললে–আপনাকে দশ লাখ টাকা সেলামী দিতে গেলে আমাদের পড়তা পড়বে না৷ বড় জোর পাঁচ লাখ টাকা ছাড়তে পারি৷ তার বেশী এক কাণাকড়িও না৷ তা ছাড়া জানেনই তো, বাঁদরদের সংখ্যা কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের মত ক্রমঃক্ষয়িষ্ণু৷ আজকের  চাহিদা যা কাল তা থাকবে না৷

 ফালতু মিনিষ্টার আর পোষাক–প্রতিষ্ঠানের সেলামী নিয়ে কষাকষিতে শেষ পর্যন্ত পোষাক তৈরীর কাজ বন্ধ হয়ে গেল৷

সবাই সমস্বরে বললে–তারপর তারপর তারপর

সভাপতি বললেন–‘এখন আর পোষাক–প্রতিষ্ঠানের তৈরী প্যান্ট–শার্ট ব্যবহারে কোন বাধা নেই–আপত্তিরও কারণ নেই৷ এমন সময় সভার এক কোণ থেকে একজন ছোকরা বানর এম. পি. (তরুণ তুর্ক) চীৎকার করে বলে উঠল–চলবে না...চলবে না পোষাক–পরা চলবে না......চলবে না৷

সবাই বললে–কেন.....কেন..... কেন?

ছোকরা বানর বললে–‘ধরুন, আমরা সবাই যদি প্যান্ট–শার্ট পরি তাহলে আমাদের সঙ্গে মানুষের তফাৎ রইল কোথায় এমনকি ন্যাজের সিংহভাগও প্যান্টের ভেতরেই থেকে যাচ্ছে৷ আর সেজন্যে মহামান্য সরকার বাহাদুর আমাদের ছাড়বেন না৷ সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর ইন্কাম ট্যাক্স ধার্য করবেন৷ তাই আমরা যদি আয়করের রাহুগ্রাস থেকে বাঁচতে চাই তাহলে আমাদের সবাইকার ‘কীশ’ হয়ে থাকা উচিত৷

ছোকরা বানরের ভক্তরা সবাই একসঙ্গে বললে–চলবে না.....চলবে না৷ পোষাক পরা চলবে না......চলবে না......হুপ্ হুপ্ হুপ্৷

চলবে না.......চলবে না চক্রান্তকারীদের কালো মুখোশ খুলে দাও.....খুলে দাও......তাদের কালো হাত পুড়িয়ে দাও পুড়িয়ে দাও–হুপ্ হুপ্ হুপ্৷

বন্ধুগণ ভাইসকল বানরজাতির ওপর সাম্রাজ্যবাদীদের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে আমাদের এই মুহূর্ত থেকে একতাবদ্ধ হতে হবে৷ আমাদের সরব হতেই হবে৷ হুপ্ হুপ্ হুপ্৷

আমরা কীশ হয়ে জন্মেছি, কীশ হয়ে আছি, আর কীশ হয়েই মরব৷ কীশ হয়ে থাকা আমাদের জন্মগত অধিকার৷ হুপ্ হুপ্ হুপ্৷    (মধুমালঞ্চ, কলিকাতা, ১৬৷৩৷৮৬)

লেখক
জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

অঙ্ক কষা তো হ’ল অনেক, বন্ধু,

অদৃশ্য খাতায়, জাগতিক  নিয়মে

তবু কেন মেলে না জীবনের হিসাব---

যত করি গণিতের সূত্র প্রয়োগ

ততই যেন ঘুরে মরি রহস্যের গোলকধাঁধায়৷

উত্তর ও দক্ষিণ মেরু পরস্পর বিপরীত

তবে কেন তারা টানে উভয়কেই

ভিন্নমুখী নদীগুলি  কেন মেশে মোহনায়?

কেন  আলো ঝলমলে অট্টালিকার নীচে

ঝুপড়িতে জ্বলে টিমটিমে টিনের প্রদীপ

দুইখাতে বয়ে যাওয়া দু’টি মন

কেন জীবন বীণায় সুর তোলে একসাথে

সুখের সংসার গড়ার প্রয়াসে?

এই বিশাল ধরিত্রীর জঙ্গম মানুষ

চাওয়া-পাওয়া, দেনা-পাওনার বেড়া ডিঙ্গিয়ে

কেন খোঁজে ছোট্ট একটি শান্তির নীড়?

লেখক
শ্রেষ্ঠা সাহা

আমি একটি ছোট্ট পাখি,

মনে অনেক আশা রাখি৷

বড় হব জয় করব,

পুরো বিশ্বখানি৷

উড়ে যাব আকাশপানে

ফিরব আবার ঘরের কোণে

সবারে আপন বলে জানি

গড়বো আবার নোতুন করে

সোনার বিশ্বখানি৷

 

লেখক
আচার্য নিত্যসত্যানন্দ অবধূত

তুমি মানুষের সন্তান

তুমি বিধাতার সেরা দান৷

বুদ্ধি–বোধিতে তুমি

ছঁুয়েছ যে আসমান৷

হূদয়েতে তাঁকে রেখে

মানুষকে ভালোবাসো

ভালোবাসো তরুলতা

পশুপাখি ভালোবাসো৷

আকাশ বাতাস মাটি

গিরি নদী ভালোবাসো

অপ্রাণিন্ যত আছে

সব কিছু ভালোবাসো৷

তোমার বুদ্ধি–শক্তি

হূদয়–গভীরে ভক্তি

মন প্রাণ দিয়ে

সব প্রাণী নিয়ে

এক পরিবার গড়ো –

তাতে আনন্দ ভরো৷

 

এ এক তত্ত্ব অভিনব

মানবতাবাদ – নব৷৷  

 

‘‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’’

Baba's Name
শ্রী প্রভাতরঞ্জন সরকার

পূর্ব প্রকাশিতের পর–

কিপ্ঢেকঞ্জুস ভাবলে–আরও এগিয়ে দেখি ...... দেখি সম্মুখে আরও কী রয়েছে৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস এগিয়ে চলেছে–তিরবেগে তুরঙ্গের মত .......বল্গাবিহীন অশ্বের মত উল্কার গতিতে৷ কিছুদূর যাবার পর সে দেখে সামনে রয়েছে মণি–মুক্তা–মাণিক্যের পাহাড়৷  মণি–মাণিক্য* সে ভাবলে–এতদূর যখন এসেছি তখন আরও মূল্যবান কিছু পাওয়া যায় কিনা এগিয়ে দেখি৷.......এবার সে দৌড়ে দৌড়ে চলেছে ...........হাত–পা অবসন্ন, দম নিতে পারছে না৷ .......সর্বাঙ্গ দিয়ে কালঘাম ছুটছে.........তবুও সে ছুটে চলেছে.......ছুটে চলেছে .......এ চলার কি শেষ নেই

কিছুদূর গিয়ে সে দেখলে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি বেহ্মদত্যি (ব্রহ্মদৈত্য)৷ বেহ্মদত্যির মাথায় ঘুরে চলেছে সুতীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত একটি প্রকাণ্ড চক্র৷ চক্রে তার মাথা কেটে মাথার ঘিলু বেরিয়ে আসছে ও ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে৷ বেহ্মদত্যি চীৎকার করে কাঁদছে৷ বলছে–‘‘গেলুম গো .....মলুম গো...... মা গো......কে কোথা আছো গো, বাঁচাও গো......আমি টাকা পয়সা চাই না....ধন দওলত চাই না.....আমি শান্তি চাই....আমি জীবনের পরম সম্পদ পরাশান্তি চাই৷’’ বেহ্মদত্যির মাথার রক্তবিন্দুগুলি চারিদিকে ছিটকে ছিটকে পড়ছে৷ আর সেই রক্তবিন্দু যেখানেই পড়ছে সেখানেই তৈরী হচ্ছে এক একটি অর্থপিশাচ৷ তারা একে অন্যের সঙ্গে হানাহানি মারামারি করছে..... তা করে নিজেরাই ধুলোয় লুটিয়ে পড়ছে.......তাদের অস্তিত্বের শেষ কণা অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে৷

কিপ্ঢেকঞ্জুস বেহ্মদত্যিকে বললে–‘‘হ্যাঁ ভাই, তোমার মাথায় চক্র ঘুরছে কেন?........ কেন এই অশেষভাবে ‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’?’’

কিপ্ঢেকঞ্জুস কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বেহ্মদত্যির মাথা ছেড়ে চক্রটা তার মাথায় আশ্রয় নিল৷ আর বোঁ বোঁ ..........বন বন করে ঘুরতে লাগল৷ যন্ত্রণায় কিপ্ঢেকঞ্জুস ডুকরে কেঁদে উঠল........আমি ধন–দওলত চাই না ..........আমি ভুল পথে চলেছিলুম..........আমি শিবের সিফারিশ মত কুবেরের সম্পদ চাই না.......আমি চাই শিবের শান্ত সমাহিত পরাপ্রশান্তি........কে, কোথা আছো গো, বাঁচাও গো..........মা গো, বাবা গো......গেলুম গো......মলুম গো.........আমাকে বাঁচাবার কেউ কোথাও কি নেই? আমি ছাই–মাখা শিবকেই চাই৷ 

বেহ্মদত্যি বললে–‘‘আমিও তোমার মত মোহগ্রস্ত অতিলোভী ছিলুম৷ তোমারই মত এইভাবে এইখানে এসে পৌঁছেছিলুম৷ এখানে এসে দেখেছিলুম আমারই মত আর এক ব্রহ্মপিশাচের মাথায় চক্র ঘুরছে৷ আমিও তাকে শুধিয়েছিলুম–হ্যাঁ ভাই, তোমার মাথায় চক্র ঘুরছে কেন? শিবের ব্যবস্থায় বিধির বিধান হচ্ছে মোহের পরিণাম এই হয়....... ‘‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে৷’’ আবার যদি কখনও আমাদের মত কোনো মোহগ্রস্ত অতিলোভী লোক আসে আর জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ ভাই, তোমার মাথায় চক্র কেন ঘুরছে৷ সঙ্গে সঙ্গে চক্রটি তার মাথায় চলে যাবে আর তুমি চক্র–শাসন থেকে মুক্তি পাবে৷ আচ্ছা ভাই, তবে এখন আসি৷ কতদিন যে ‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’ অবস্থায় ছিলুম তার হিসেবনিকেশ নেই৷ তাই আমাকে এখন ফিরতে হবে৷’’

বেহ্মদত্যি আরও বললে–বেহ্মদত্যি হবার সময় যে বেল* (*মূল শব্দ হচ্ছে বিল্ব৷ বর্গীয় ‘ব’ দিয়ে লিখতেই হবে৷ পর্যায়বাচক শব্দ হচ্ছে ইক্ষবাকু, মহাফলম, শ্রীফলম৷ ‘বিল্’ শব্দের অর্থ ছিদ্র৷) গাছটিতে আশ্রয় নিয়েছিলুম এই দীর্ঘকাল পরে সেই গাছটি নিশ্চয়  মরে গেছে৷ তাই আস্তানা হিসেবে আবার নোতুন আর একটি বেলগাছের সন্ধান করতে হবে৷ শিবের কৃপায় আবার যখন তুমি মুক্তি পাবে, তখন আমার সেই বেলগাছটির তলায় এসো, আমি তোমাকে মই দিয়ে গাছে তুলে নোব৷

কিপ্ঢেকঞ্জুস নিঃসঙ্গ অবস্থায় সেখানে দাঁড়িয়ে রইল৷ তার মাথা দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে৷ সেই রক্তবিন্দু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছিটকে পড়ছে৷ প্রতি বিন্দু রক্তকণা থেকে গজিয়ে উঠছে মোহবদ্ধ লোভী দানবের দল৷ কিপ্ঢেকঞ্জুস চীৎকার করে কাঁদছে........মাগো.......বাবা গো.......গেলুম গো.......মলুম গো......‘চক্রং ভ্রমতি মস্তকে’........৷

তাহলে মোহ রিপুর পরিণাম বুঝলে তো মুখ্যতঃ এই মোহ রিপু থেকেই ঘৃণা–ভয় প্রভৃতি পাশগুলির উদ্ভূতি৷ এখান থেকে  পরিত্রাণ পাবার একমাত্র পথ হচ্ছে পরম পুরুষের ভাবনা নেওয়া৷ অন্য কোনো পথ নেই ....‘‘নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায়’’৷


*মণি মানে যে–কোনো মূল্যবান রত্ন •gems and jewels— ৷ মাাণিক্য মানে মূল্যবান রক্তপ্রস্তর–বাংলায় চুনী, ইংরেজীতে রুবি•ruby—৷ মুক্তো–বাংলা ও সংস্কৃতে ‘মুক্তা’, হিন্দুস্তানীতে ‘মোতি’, ইংরেজীতে •pearl—¼ দিয়ে অনায়াসেই একটা সোণার পাহাড় কেনা যায়৷