আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

যোগের সংজ্ঞা, তাৎপর্য ও লক্ষ্য

প্রশ্ণ হচ্ছে–যোগ কী? এখন যোগ সম্বন্ধে এ যাবৎ অজস্র ব্যাখ্যা, অজস্র টীকা–টিপ্পনী প্রচলিত রয়েছে৷ মহান্ দার্শনিক পতঞ্জলির মতে, ‘যোগশ্চিত্ত–বৃত্তিনিরোধঃ’৷ সংস্কৃত ‘যুন্জ্’ ধাতুর উত্তর ‘ঘঙ্’ প্রত্যয় যোগ করে ‘যোগ’ শব্দ নিষ্পন্ন হয়েছে৷ ‘যুন্জ্’ ধাতুর মানে যোগ করা, To add. যেমন– ২ + ২ = ৪৷ এটা যোগ করা হ’ল৷ যোগশ্চিত্তবৃত্তিনিরোধ্’ – পতঞ্জলি প্রদত্ত যোগের এই সংজ্ঞার সাথে যোগ বা addition–এর কোনো সম্পর্ক নেই৷

অর্থ ও পরমার্থ

শাস্ত্রে বলা  হয়েছে,

‘‘পার্শদ্ধো ভবেজ্জীবঃ পাশমুক্তো ভবেচ্ছিব৷’’

ব্যষ্টিসত্তা যখন মায়াজালে আবদ্ধ থাকে তখন তাকে বলে  জীব বা অণুমন, অর্থাৎ  জীবের বৈশিষ্ট্যই হ’ল ন্ধন৷ ব্রহ্মকৃপায়  সাধনার  দ্বারা  যাঁরা এই  বন্ধন ছিন্ন করে  যখন   নিজেকে  মুক্ত  করতে পারেন  তখন তাঁরা শিবত্বে  উন্নীত  হন৷  শিব হলেন বন্ধনমুক্ত আর জীব বন্ধনযুক্ত৷

পরমপুরুষের বিশ্বরূপ

সৃষ্টির প্রারম্ভের আগের কথা৷ সে সময় দেশ–কাল–পাত্রের মত সাপেক্ষ সত্তা ছিল না৷ একমাত্র ছিল অখণ্ড অসীম, বৃহৎ, সর্বব্যাপী সত্তা, আর সেই  সত্তার সাক্ষিত্বরূপে ছিলেন পরমপুরুষ৷ সেই অখণ্ড সৃষ্টির রচয়িতা পরমপুরুষ নিজেকেই অনেক রূপে নানাপ্রকারে অভিব্যক্ত করলেন৷

‘‘ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি, ত্বং কুমার উত বা কুমারী৷

ত্বং জীর্নোদণ্ডেন বঞ্চয়সি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ৷’’

‘‘নীলঃ পতংগো হরিতো লোহিতাক্ষ

স্তত্তিদ্গর্ভ ঋতবঃ সমুদ্রাঃ৷

অনদিমত্বং বিভুত্বেণ বর্ত্তসে

 যতোজাতানি ভুবনানি বিশ্ব৷৷’’

পরমপুরুষের বিশ্বরূপ

সৃষ্টির প্রারম্ভের আগের কথা৷ সে সময় দেশ–কাল–পাত্রের মত সাপেক্ষ সত্তা ছিল না৷ একমাত্র ছিল অখণ্ড অসীম, বৃহৎ, সর্বব্যাপী সত্তা, আর সেই  সত্তার সাক্ষিত্বরূপে ছিলেন পরমপুরুষ৷ সেই অখণ্ড সৃষ্টির রচয়িতা পরমপুরুষ নিজেকেই অনেক রূপে নানাপ্রকারে অভিব্যক্ত করলেন৷

‘‘ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি, ত্বং কুমার উত বা কুমারী৷

ত্বং জীর্নোদণ্ডেন বঞ্চয়সি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ৷’’

‘‘নীলঃ পতংগো হরিতো লোহিতাক্ষ

স্তত্তিদ্গর্ভ ঋতবঃ সমুদ্রাঃ৷

অনদিমত্বং বিভুত্বেণ বর্ত্তসে

 যতোজাতানি ভুবনানি বিশ্ব৷৷’’

জিদ্ চাই

আগে বলেছিলুম, ভালো কাজের জন্যে জিদ্ চাই৷ তাই সাধকের মনে জিদ্ থাকা দরকার৷ শাস্ত্রে আছে, পার্বতী শিবকে জিজ্ঞাসা করলেন, কে এই সংসারে উন্নতি করে, কী তার রহস্য? দেখতে পাচ্ছি, কেউ বড় বড় কাজ করে জীবনে মহান হয়, কেউ বা শুয়ে বসেই থাকে চিরকাল৷ কেউ কেউ তো কলুর বলদ হয়েই থেকে যায়, আবার কারো কারো উন্নতি হয়৷ কেউ অনেক পড়েও খারাপ ফল করে, কেউ বা অল্প পড়েও ভাল ফল করে৷ এই সমস্ত কিছুর পিছনে রহস্য  কী?

উত্তরে শিব বললেন,

‘‘ফলিষ্যতীতি বিশ্বাসঃ সিদ্ধের্প্রথমলক্ষণ৷

দ্বিতীয়ং শ্রদ্ধয়া যুক্তং তৃতীয়ং গুরুপূজনম্৷৷

চতুর্থো সমতাভাবঃ পঞ্চমেন্দ্রিয়নিগ্রহ৷

বিশ্বৈকতাবাদ দ্বারা ধর্মের প্রতিষ্ঠা

পরমসত্তা যখন প্রকৃতির বন্ধন থেকে মুক্ত, সেই অবস্থা হচ্ছে নির্গুণ আর বন্ধনযুক্ত পরমসত্তা সগুণ৷ সগুণেও আছে দু’টি বিভাগ–একটা তার রূপময় অস্তিত্ব আর অন্যটি অরূপ৷

মানুষের মধ্যে যে বুদ্ধি, বোধি, আমি–বোধ (I-feeling) ইত্যাদি আছে এরা সব অরূপ৷ সেই রকম সগুণ ব্রহ্মেরও বুদ্ধি, বোধি ও আমি–বোধ অরূপ৷ সেইজন্যে সেগুলির কোনটাই আমরা দেখতে পাই না৷

গায়ত্ত্রী মন্ত্র

প্রাচীনকালে দীক্ষার দু’টি পদ্ধতি ছিল৷ এই দুই দীক্ষা পদ্ধতির মধ্যে প্রথম ছিল বৈদিকী দীক্ষা৷ দ্বিতীয় তান্ত্রিকী দীক্ষা অর্থাৎ প্রথমে ক্ষৈদিক বিচার–আচার–পদ্ধত অনুযায়ী দীক্ষা আর তন্ত্রানুসারী দীক্ষা৷ বৈদিকী দীক্ষার মুখ্য মন্ত্র ছিল গায়ত্ত্রী মন্ত্র৷ বৈদিকী দীক্ষার মূলনীতি ছিল ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সৎপথ তথা আনন্দম্–এর পথ–নির্দেশ করা৷ তান্ত্রিকী দীক্ষার মূল নীতি ছিল সেই পথে এগিয়ে চলা৷ প্রথমটায় পরমাত্মার কাছে পথ– প্রদর্শনের জন্যে প্রার্থনা করা, আর দ্বিতীয়টিতে সাধক এগিয়ে চলে সেই পথে৷ তাই তান্ত্রিকী দীক্ষালাভের পরে সাধককে গুরুর নির্দেশানুসারে অগ্রসর হতে হয়৷

আচরণাৎ ধর্ম

ধর্ম বৈবহারিক, সৈদ্ধান্তিক নয়৷ কে ধার্মিক, কে ধার্মিক নয়–তা তার বিদ্যা, বুদ্ধি বা পদমর্যাদা থেকে প্রমাণিত হয় না৷ কে ধার্মিক তা প্রমাণিত হয় তার আচরণ থেকে৷ কে অধার্মিক তাও প্রমাণিত হয় তার আচরণ থেকে৷ যে ধার্মিক হতে চায়, তাকে তার আচরণ ঠিক করতে হবে৷

আধ্যাত্মিক প্রগতির তিনটি স্তর

কাল বলেছিলুম যে, মানুষ কোন অবস্থাতেই পশু হতে পারে না৷ ঈশ্বরসৃষ্ট বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে একটা শাখা হ’ল মানুষ, একটা হ’ল উদ্ভিদ, আর একটা হ’ল পশু৷ পশুর মধ্যেও আবার স্তরবিন্যাস আছে, উদ্ভিদের মধ্যেও স্তরবিন্যাস আছে৷ সব উদ্ভিদ সমান নয়৷ সব পশুও সমান নয়৷ আবার মানুষেরও  স্তরবিন্যাস আছে৷

‘‘সর্বে চ পশবঃ সন্তি তলবদ্ ভূতলে নরাঃ৷

তেষাং জ্ঞান প্রকাশায় বীরভাবঃ প্রকাশিতঃ

বীরভাবং সদা প্রাপ্য ক্রমেণ দেবতা ভবেৎ৷৷’’

জড়বাদ ও অধ্যাত্মবাদ

, তা হচ্ছে চিতিশক্তি৷ এই চিতিশক্তি চৈতন্যসত্তা আবার শক্তিসত্তাও বটে– এইভাবে চিতিশক্তি দুইয়েরই কাজ করে৷ এইজন্যেই একে চিতিশক্তি বলা হয়৷ বস্তু নয় কিন্তু বস্তুকে যে রূপ প্রদান করে তাই শক্তি বা প্রকৃতি৷ এই প্রকৃতিই বস্তুতে রূপ প্রদান করে প্রকারভেদ সৃষ্টি করে৷