পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সামনে এসে গেছে৷ দিল্লীর নজর এখন বাঙলার দিকে৷ প্রধানমন্ত্রী সহ দিল্লীর নেতা মন্ত্রীদের রাজ্যে আনাগোণাও বাড়ছে৷ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বাঙলায় এসে রাজ্যবাসীর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তিনি বিকশিত বাঙলা গড়ে দেবেন৷ কিন্তু প্রশ্ণ হচ্ছে দেশের প্রধানমন্ত্রী একটা রাজ্যের উন্নয়নের জন্যে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্যে অপেক্ষা করবেন কেন! প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাই কী একটা রাজ্যের উন্নয়ণের জন্য যথেষ্ট নয়! মোদির আমলে রেল ডাকঘর সহ রাজ্যে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সংস্থার শাখাগুলিতে গত দশ বছরে ভিনরাজ্য থেকেই নিয়োগ বেশি হয়েছে৷ এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে বঞ্চনা তো আছেই৷
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠাময় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও রাজ্যে সব সময় একই দলের শাসনে থাকতে হবে এমন কোন আইন সংবিধানে নেই৷ যদিও বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর একটা স্লোগান বাজারে ছেড়েছে--- ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’৷ অর্থাৎ কেন্দ্রে রাজ্যে একই দলের শাসন থাকা চাই---তবেই রাজ্যের বিকাশ সম্ভব৷ এ কেমন কথা! একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিপন্থী চিন্তাধারার প্রকাশ দিল্লীর শাসক দলের এই কথায় স্পষ্ট হচ্ছে৷
বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদে ও বিধানসভায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন মূলত দলীয় সমর্থকদের দ্বারা৷ নির্বাচনে দলই প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়৷ কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আর দলের থাকেন না, তিনি দেশের আপামর জনগণের প্রতিনিধি৷ তাঁকে কাজ করতে হয় দল - মত - সম্প্রদায় -জাত-পাতের উর্দ্ধে উঠে সর্বশ্রেণীর মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে৷ গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই৷ কিন্তু দিল্লীর শাসক দলের মন্ত্রীরা দলীয় ভাবধারার উধের্ব উঠতে পারছেন না৷ দলের মনোনয়ন ও দলীয় সমর্থকদের দ্বারা নির্বাচিত হলেও দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কোন বিশেষ দলের নন, তিনি দেশের বা রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী৷ কিন্তু দেশের অধিকাংশ মন্ত্রীরাই দল বা দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সর্বশ্রেণীর মানুষের স্বার্থে কাজ করতে পারেন না৷ এদের হাতেই গণতান্ত্রিক মর্যাদাই শুধু ক্ষুণ্ণ্ হবে তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতও দুর্বল হবে৷ ২০১৯ সাল থেকে বিজেপি বাঙলা দখলের চেষ্টা করে যাচ্ছে৷ তবে জনগণের আস্থার ওপর নির্ভর করে নয়, নানা ছল-চাতুরি করে, রাষ্ট্রশক্তি, অর্থশক্তি, সাংঘটনিক শক্তি প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হয়েছেন৷ এখন রাজ্য সরকারকে দুর্বল করার ও জনগণের সামনে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করতে নানা অসৎ উপায় অবলম্বন করেছে৷ তার অন্যতম হলো আর্থিক দিক থেকে বাঙলাকে বঞ্চনা করা বিশেষ করে ২০২১শের বিধানসভা ভোটে ২০০ পারের আবাজ দিয়েও ১০০ ছুঁতে না পারায় দিল্লির শাসক বাঙালীকে ধনে প্রাণে মারার কৌশল নিয়েছে৷ ১০০ দিনের কাজ, তপশিলি সম্প্রদায়ের উন্নয়ণ প্রকল্প প্রভৃতি কাজে রাজ্য সরকারের সাফল্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি থেকে ভাল হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে এই সব প্রকল্পের টাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হচ্ছে৷ যা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় মোটেই শুভ লক্ষ্মণ নয়৷ দিল্লির শাসকের মনে রাখা উচিত কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যগুলিকে বিভিন্ন উন্নয়ণ খাতে যে অর্থ দেয় সেটা দিল্লীর টাকা নয়, রাজ্য থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের উপার্জিত রাজস্বের একটা অংশ৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তার ন্যায্য প্রাপ্যটুকুও পাচ্ছে না৷ স্পষ্ট কথা দিল্লির শাসক দিচ্ছে না৷
এই অবস্থায় সামনে বিধানসভার সাধারণ নির্বাচন৷ প্রধানমন্ত্রী রাজ্যে প্রচারে এসে বিকশিত বাঙলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন৷ মানুষ বুঝে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর কথায় ও কাজের ফারাক৷ শূন্য এ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ, সুইসব্যাঙ্কের কালো টাকা ফেরৎ আনা, বছরে দু-কোটি চাকরী, নেতাজী সুভাষচন্দ্রের সব গোপন ফাইল প্রকাশ্যে আনা -প্রধানমন্ত্রীর এই সব ভূয়ো প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মানুষ পরিচিত৷ গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত আর্থিক বঞ্চনা যা পূর্বতন সব সরকারের সীমা লঙ্ঘন করে গেছে৷
তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিতে আর ভরষা নেই বাঙালীর৷ ১৯৪৭-এর মধ্যরাত থেকে খণ্ডিত পশ্চিমবঙ্গের প্রতি দিল্লির শাসকের যে বঞ্চনা শুরু হয়েছিল মোদি জমানায় তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে৷ বাঙালীর সামনে আজ একটাই পথ খোলা আছে শাসকের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে না ভুলে সর্ব শ্রেণীর মানুষের সার্বিক বিকাশের জন্যে বাঙলার প্রতি বঞ্চনার বিরুদ্ধে ও মানবতার আর্থিক মুক্তির দাবীতে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া৷ পুঁজিবাদ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির বস্তাপচা তত্ত্ব কথায় জনগণের পেট ভরবে না৷ অর্থনীতি হবে বাস্তবমুখী, স্বয়ং সম্পূর্ণ ও প্রয়োগভৌমিক বিজ্ঞান যা শুধু মানুষই নয়, সর্বজীবের সর্ব অস্তিত্বের সার্বিক উন্নয়ন করতে সক্ষম হবে৷ পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার প্রতিপাদিত প্রাউট তত্ত্বেই বাস্তবমুখী অর্থনীতির সুস্পষ্ট পথ নির্দেশনা আছে৷ তাই এই মহৎ কাজের জন্যে প্রাউটিষ্টদের সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে৷ মানবতার আর্থিক মুক্তি অর্জন একমাত্র প্রাউটিষ্টদের পক্ষেই সম্ভব৷
- Log in to post comments