ব্রিটিশ সময়ে কলকাতা ওদের রাজধানী ছিল, বাঙলা থেকেই ওরা মূলত শাসন চালাতো৷
এরফলে বাঙালী লোকেরাই বেশি ইংরেজদের অধীনে কাজ করার সুযোগ পেতো, এবং ব্রিটিশরা সেটা দেখে এখানেই মানে সমগ্র বাঙলায় নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করলো৷
বাঙলার ঘরের ছেলে মেয়েরা আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকলো৷
এতে ব্রিটিশদের ব্যবসা, শাসন করতে অবশ্যই সুবিধা হলো৷ কিন্তু তলায় তলায় একটা মহাবিপদ ঘনিয়ে এলো৷ শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা ব্রিটিশরা যে লুট করছে, ভারতকে পরাধীন করে রেখেছে সেটা বুঝতে পারলো, ফলতঃ ১৮৯০ পরবর্তীতে প্রশ্ণ আন্দোলন প্রতিবাদ লড়াই এগুলো শুরু হয়ে গেলো, স্বাধীন হবার তাগিদ বেড়ে গেলো৷
আরসেই বিপ্লবীদের প্রচুর অর্থ সাহায্য করতো বাঙলার ব্যবসায়ীরা, কারণ তারাও চাইতো ব্রিটিশদের অধীনে না থেকে স্বাধীন ব্যবসায়ী হবে৷
এটা ব্রিটিশরা বুঝতে পারলো৷ ফলে এখানে ব্যবসায়ীদের পুঁজি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলো, তাদের ব্যবসা দুর্বল করার চেষ্টা করলো এবং নিজেদের ব্যবসার কেন্দ্র বাঙালির হাতের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করলো৷
সেটার জন্য প্রথমে তারা ১৯০৫ এ বাংলা ভাগ করলো৷ কিন্তু তখন সমাজে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, চিত্তরঞ্জন ইত্যাদি বহু বহু মনীষী ছিলেন যারা চেষ্টা করে ৬ বছর পর ১৯১১ তে বিভক্ত বাংলাকে আবার যুক্ত করে দিলেন৷
তখন ব্রিটিশরা বাঙালীর পুঁজি সরানোর জন্য তাদের অধীনস্থ যাবতীয় ব্যবসার কেন্দ্র দিল্লি নিয়ে গেলো রাজধানী স্থানান্তর করে৷
সেই প্রথমবার বাংলা ব্যবসায় প্রথম ধাক্কা খেলো, তবে তখনও বাঙলার কাছে পুঁজি ছিল এবং ছিল খনিজ সম্পদ৷ সেই খনিজ ব্রিটিশদের বাঙলা থেকেই নিয়ে যেতে হতো, এবং পশ্চিমের দিকে কারখানা খুললে মাল নেওয়া দেওয়ার অসুবিধের ফলে কল কারখানা গুলো সেভাবে স্থানান্তর হলো না৷
এরপর স্বাধীনতা হলো, ব্রিটিশরা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে ভারতের পশ্চিমের মূলত অশিক্ষিত জাতিদের নিয়ে, ওদের ক্ষমতা দিয়ে বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভেঙে দিলো, কারণ ওরাই সব থেকে বেশি ক্ষতি করেছিল ব্রিটিশদের, ভবিষ্যতে শক্তিশালী হলে আবারও করার সম্ভাবনাও থাকতে পারে ভেবে৷ এই দুই জাতিকে দুর্বল করে দিলো৷ ৬০ নাগরিককে ভিখারী বানিয়ে দিলো ঘর বাড়ি কাপড় চোপড় ছাড়া৷
দেশ ভাগের ফলে পশ্চিমবাংলার বহু শিল্পাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের কাঁচা মালের উপর নির্ভর ছিল, সেগুলো ধুকলো৷
কিন্তু বিধান রায় পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমে আধুনিক কারখানা ইত্যাদি গড়লেন, পশ্চিম বাংলার ব্যবসা গতি পেলো৷
সেটা নেহেরু দেখলেন, বুঝলেন বাংলায় তো আমি ভোট পাই না, বিধান রায় এখানে শিল্প করলে পশ্চিম ভারতে ভোট আমি দীর্ঘমেয়াদি সময় জুড়ে পাবো কি করে ? আর শিল্পপতিরা তখন পশ্চিমে যেতে চাইতো না কারণ পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমে, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা, বিহারের খনিজ ওখানে নিয়ে যেতে যে কোস্টিং পড়তো তাতে মালের দাম অনেক বেশি হতো, ব্যবসায় প্রভাব পরতো৷
তাই নেহেরু প্রথমে ভারতের সব খনিজ সম্পদ অল্প স্বল্প যেগুলো রাজ্য সরকার গুলোর নিয়ন্ত্রণে ছিল সেগুলো কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে নিলেন৷ তারপর মাশুল শুল্ক নীতি বা ফ্রেট ইকিলাইজেশন পলিসি নিয়ে আসলেন৷ যাতে ভারত সরকারের মালগাড়ি খনিজ সারা ভারতে একই দামে বিক্রি করবে৷
এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেলো, পশ্চিমে কারখানা করলে পুঁজিপতিরা একই দামে কাঁচা মাল পাবে যা বাঙলায় কারখানা করলে পায়৷
আরমূলত রপ্তানি হতো পশ্চিমের দেশগুলির সাথে৷ ফলে পশ্চিমে কারখানা করলে আরব সাগরও পাওয়া যাবে, বাংলা থেকে জাহাজকে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগর পেরিয়ে আরব সাগর ধরতে হবে না৷
এরফলে আগামী ১০ বছর একে একে ব্যবসায়ীরা নিজেদের কারখানা পশ্চিমের দিকে সরাতে থাকলো৷ আর বাংলায় শ্রমিক আন্দোলনের ভিত্তিভূমি তৈরি হলো, যার হাত ধরে আগামী দশকে পুঁজিবাদের কালো হাত ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও এলো৷ ওরা শ্রমিক আন্দোলন করে এসেছে, তাই পুঁজিপতিদের বন্ধু হতে পারে নি কোনোদিন৷ আরও কিছু কারখানা যেগুলো ছিল সেগুলোর অধিকাংশ সেই সময় বন্ধ হলো, তালা ঝুলে গেলো৷
কিন্তু ওদের সরকার বাংলার গরীব থেকে গরীব লোকেদের জমির পাট্টা দিয়েছিল, নাগরিক অধিকার দিয়েছিল, এই জন্য ওরা এতদিন টিকেছিল৷
এরপর ওরা হঠাৎ ২৫-৩০ বছর পর উপলব্ধি করলো, শিল্প করতে হবে, তাই টাটা ও সালেম গোষ্ঠীর সাথে কথা বললেন৷ কিন্তু কোথায় জমি কাদের জমি কিছুই শনাক্ত করলেন না৷ টাটার সিঙ্গুর পছন্দ হলো, সালেম এর নন্দীগ্রাম৷
আরবামেরা সঙ্গে সঙ্গে জমি ছেড়ে দাও, টাকা নাও, ফোটো৷ মানুষের জমি, চাষের জমি নিতে গেলে মানুষকে বোঝানো কথা বলা ইত্যাদি কিছুই করলো না, সোজা শিল্প করবো জমি ছাড়ো৷
ফলে এইভাবে অনৈতিক জমি অধিগ্রহণের ফলে মানুষ ক্ষেপে গেলো, বিরোধী মমতা ব্যানার্জী তাদের সঙ্গ দিলো৷
নন্দীগ্রামে বামেরা কিভাবে কি করেছে দেখে সালেম চলে গেলো৷
সিঙ্গুরের মানুষরা আদালতে গেলো৷ আদালত বামেদের বললো জমি অধিগ্রহণ নীতি অবৈধ ছিল, এভাবে নাগরিকদের বৈধ জমি নেয়া যায় না, ফেরত দাও, উপরন্তু পেনাল্টি দাও৷ ফলে টাটা হতাশ হয়ে চলে গেলো৷
এটা সংক্ষেপ ইতিহাস, এইগুলো আরও বিস্তারিত ভাবে সকল বাঙালীর জানা উচিৎ, এগুলো আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না, তাই বাইরের থেকে লোকেরা স্যুট বুট পরে ইংরেজিতে, হিন্দিতে মিথ্যাচার করলে আজকের প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ভাবে ওরা ঠিকই বলছে হয়তো৷
গুজরাটি বাবুরা প্রকৃত ইতিহাসের কিছুই না বলে বাংলা দখলের জন্য বলে দিলো অমুক ব্যক্তি, অমুক মহিলা, অমুক দল সরিয়ে দিন এরাই বাংলার পতনের জন্য দায়ী৷
কোন পতন যেটা ১৯১১ তে শুরু হয়েছিল ? ১৯৫২ তে শেষ পেরেক পুতে দিয়েছিল নেহেরু ?
এরমানে সহজেই বোঝা যায়, ওদের কোনো উদ্দেশ্য আছে৷
এইজন্য প্রকৃত ইতিহাস জানা অত্যন্ত প্রয়োজন৷ নাহলে যারা আমাদের দুর্বল করলো, তারাই আজকে এসে বলছে অমুক বাঙালি তমুক বাঙালী তোমাদের দুর্বল করেছে, আমরা আসলে তোমরা শক্তিশালী হয়ে যাবে, আর ইতিহাস না জানা প্রজন্ম সেটা বিশ্বাস করে ফেলছে৷
এবার বলি উদ্দেশ্য কি ?
এখন পরিস্থিতি দেখুন, বাঙলায় কোনো দুর্নীতি হলে সেরা বিরোধী দল প্রকাশ করছে, দিল্লি থেকে এজেন্সি এসে সেটার তদন্ত করছে৷
মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করছে, আপনি জানতে পারছেন৷
ওরা মানে বিজেপি আসলে এখানে কাঠপুতুল বসিয়ে লুট করবে, এখানের সম্পদ লুটে পুটে বাঙালীকে বঞ্চিত করে গুজরাট দিল্লি নিয়ে যাবে, আর এখানের যাবতীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হবে দিল্লি থেকে, মিডিয়া আদালত সহ সব৷ তখন মানুষ জানতেও পারবে না কি ভাবে কি হচ্ছে, বিরোধী নেতারা রাস্তায় চেঁচামেচি করলেও মিডিয়া দেখাবে না৷
আর ধীরে ধীরে উত্তরবঙ্গ দক্ষিণবঙ্গ গোর্খাল্যান্ড কাঁমতাপুরী ইত্যাদি করার চেষ্টা করবে/ করবে, বাঙালী আরও দুর্বল হবে, মুর্শিদাবাদ মালদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে ওখানে কাশ্মীর লাদাখ এর পরিস্থিতি তৈরি করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি, যাতে বাঙালি দুর্বল হয়ে যায়, ওদের ফ্যাসিস্ট শাসনের কোনো ভাবে কোনো জাতি প্রবল বিরোধিতা না করতে পারে, আর সংখ্যাবলে বাঙালী দুর্বল হয়ে, ত্রিপুরার মতন ছোট ছোট অনেক গুলি রাজ্যে পরিণত হোক, দিল্লিতে আওয়াজ কে ভেঙে দিয়ে, অধিকার আরও দুর্বল হোক দিল্লিতে৷
এটাই ওদের উদ্দেশ্য৷
বিভিন্ন ছলা, কলা, সাম, দাম, দণ্ড করে ব্যর্থ হয়েছে এতদিন, এখন নতুন ফন্দি ছজ্জট্ট, ভোটাধিকার কেড়ে/নকল ভোটার তৈরি করে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা৷
এরপরেও যদি ওদের ফাঁদে পা দিয়ে দেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী, তাহলে বাঙলার এই পতন আর কেউ রুখতে পারবে না, ওদের বা আর এস এস এর এজেন্ডায় এটা, উত্তরবঙ্গে কামতাপুরী, উত্তরবঙ্গ, গোর্খাল্যান্ড বলেই এরা ভোট নিচ্ছে৷ ভেঙে গেলে দুর্বল কারা হবে? বাঙালী৷
তাই সকল বাঙালীর উচিৎ, এদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক ভাবে লড়াই করে, এদের রাজ্য থেকে নীরবে বিতাড়িত করুন৷ প্রয়োজনে বাঙলার বিকল্প যে দলগুলি আছে যারা বাংলার জাতীয়তাবাদী আদর্শে চলে, বাঙলা ও বাঙালীর আদর্শে চলে তাদের শক্ত করে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির বিরুদ্ধে বিকল্প তৈরি করুন৷
বর্তমানে সেটা না থাকলে তৈরি করুন, শক্ত করুন, সহযোগিতা করুন, আমরা বাঙালী এরকমই একটি দল, ওদের আদর্শ জেনে সহযোগিতা করতে পারেন, শক্তিশালী করতে), কিন্তু ভুল করেও বর্তমান দিল্লির সরকারের হাতে রাজ্য তুলে দিলে বাংলার আর রক্ষা থাকবে না৷ বাঙলা ও বাঙালীর অধিকার দুর্বল হবে৷
তাই সেই অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বর্তমানে ওদের বিতাড়িত করুন বাঙলা থেকে
- Log in to post comments