সম্পাদকীয়
আর এস এস ও বিজেপি দলের বিরুদ্ধে বাঙলা বিরোধী অভিযোগ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বিজেপি বিরোধী দলগুলি করে আসছে৷ অভিযোগটা যে নিছক মনগড়া নয় তা বিজেপি নেতারা বার বার প্রমাণ করছেন৷ বাঙালী বিদ্বেষ বিজেপির অলিখিত দলীয় কর্মসূচির মধ্যেই পড়ে৷ বঙ্গবাসী বিজেপি নেতারাও এই কর্মসূচি অনুসরণ করে চলে৷ তাই অ-বাংলাভাষী বিজেপি নেতাদের বাংলা ও বাঙালী সম্পর্কে নানা কটুক্তির কোন প্রতিবাদ বাংলাভাষী বিজেপি নেতারা কখনও করেনি৷ বরং রাজনৈতিক লড়াইতে পরাস্ত হয়ে কেন্দ্রের সরকারকে পত্র লিখে রাজ্যের ন্যায্য প্রাপ্য দিতে নিষেধ করে রাজ্যবাসীর স্বার্থ বিঘ্নিত করে৷
মধ্যপ্রদেশের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ইন্দর সিং পারমার নিম্ন শিক্ষার হীনরুচির পরিচয় দিয়ে আধুনিক ভারতের জনক, ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা রামমোহন রায় সম্পর্কে কটুক্তি করেন৷ ওই মন্ত্রী বলেন রামমোহন রায় ব্রিটিশের দালাল, ধর্মপরিবর্তনের কুচক্রী, ভূয়ো সমাজ সংস্কারক৷ পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে আর এস এসের ভূমিকা এখানে আলোচনা না করলেও চলে৷ কিন্তু আর এস এস বিজেপি যে এখনও মধ্যযুগীয় সমাজ ব্যবস্থায় পড়ে থাকতে চায় তা তাদের নেতাদের কাজে কর্মে কথা বার্র্তয় প্রায় প্রকাশ পায়৷
এই স্বাধীন ভারতে ১৯৮৭ সালে ভারতের মরুরাজ্য রাজস্থানে অষ্টাদশী রূপ কানোয়ারের সতী হওয়ার ঘটনায় হইচই পড়েছিল৷ ওই ঘটনায় রাজস্থানের বিজেপি নেতা ভৈর সিং শেখাওয়াতের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল৷ আর এক বিজেপি নেতা কল্যাণ সিং বলেছিলেন সতী হওয়া গর্বের ব্যাপার৷ একজন উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর সমাজ সংস্কারক রামমোহন রায়ের প্রতি কটুক্তিতে মনে করা যেতেই পারে বিজেপি এখনও সেই মধ্যযুগীয় বর্বর সামাজিক প্রথায় বিশ্বাসী৷ সেই কারণেই রামমোহন রায়ের প্রতি বিজেপি নেতাদের এত বিদ্বেষ৷ রামমোহন রায়ের আন্দোলনের পরিনামেই ১৮২৯ সালে এই বর্বর প্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করেব্রিটিশ সরকার৷ তবে রামমোহন রায় শুধু সতীদাহ প্রথাই রোধ করেননি, তিনি ছিলেন ব্রহ্মসভার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন, এছাড়া আধুনিক বাংলা শিক্ষার প্রচলনে নারীর অধিকার, নারীর শিক্ষায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য৷
তবে শুধু রামমোহন বিরোধী বললে ভুল হবে, বিজেপি দলটাই বাঙালী বিদ্বেষী৷ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙলা যখন শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিক্ষায়, সমাজ ও রাজনৈতিক চেতনায় অবশিষ্ট ভারত থেকে অনেক এগিয়ে তখনও ভারতের বিশেষ করে আর এস এসের আঁতুড় ঘর উত্তর পশ্চিম ভারত সেই মধ্যযুগীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেছিল৷ আজও সেই গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারেনি আর এস এস বিজেপি৷ তাই তার পরতে পরতে এত বাঙালী বিদ্বেষ৷
সম্প্রতি বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালী পরিযায়ী শ্রমিকরা বাংলা ভাষা বলায় তাদের উপর বিদেশী বাংলাদেশী বলে অমানবিক নির্যাতন করা হয়৷ ভোটের কয়েক মাস আগে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের পশ্চাতেও থাকতে পারে কোন অসৎ উদ্দেশ্য৷ প্রতিবাদে সরবও হয়েছে বিরোধীরা৷ পর পর নির্বাচনী যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে রাজ্যবাসীর বিভিন্ন কল্যাণ প্রকল্পের টাকা অসৎ উদ্দেশ্যে আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার যা রাজ্যের ন্যায্য পাওনা৷ এই সেদিন অসমের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি দলের হিমন্ত বিশ্বশর্র্ম রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার অপরাধে রাষ্ট্রদোহের অভিযোগ এনেছে৷ বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি তো রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থানকে গুলিয়ে ফেলে৷ বিজেপি নেতার মতে স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন বিভ্রান্ত বামপন্থী৷ উত্তর প্রদেশের স্কুল পাঠ্য থেকে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া, বিদ্যাসাগরের মূর্ত্তিভাঙা--- বাঙলা বিদ্বেষের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে৷ তবে এবার মধ্যপ্রদেশের উচ্চ শিক্ষামন্ত্রীর হয়তো খেয়াল ছিল না পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি! রামমোহন রায় সম্পর্কে বিজেপি নেতার কটুক্তিতে বঙ্গ বিজেপি নেতাদের মাথায় হাত৷ অবশেষে পরিস্থিতি বুঝে মধ্য প্রদেশের বিজেপি মন্ত্রী ক্ষমাপ্রার্থী৷
প্রশ্ণ হলো তিনি কি ক্ষমার যোগ্য৷ আর এস এস দলটাই তো বিদ্বেষ বিষে জর্জরিত৷ বাঙালী বিদ্বেষ মুসলিম বিদ্বেষ, দলিত বিদ্বেষ৷ শুধু পরিস্থিতিতে সাময়িক ভোল পাল্টায়৷ মধ্যপ্রদেশের ওই মন্ত্রী অত্যন্ত সচেতন ভাবেই রামমোহন সম্পর্কে কটুক্তি করেছেন৷ তিনি তার দলীয় নীতির বাইরে যাননি৷ শুধু সময়ের হিসেব ভুল করায় ক্ষমা প্রার্থী৷ এহেন দলকে বাঙালী ক্ষমা করবে কি না তা দেখার জন্যে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে৷
- Log in to post comments