দুর্গাপূজার মত কালীপূজার ইতিহাসও খুব প্রাচীন নয়৷ তন্ত্রের উদ্ভব সাত হাজার বছর আগে হলেও কালীপূজার প্রচলন মাত্র চারশ’ বছর আগে৷ এর প্রচলন করেছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ৷ (শঙ্করনাথ রায়ের ভারতের সাধক–৩য় খণ্ড দ্রষ্টব্য)
কোন দেবদেবীর মূর্ত্তি গড়ে পূজার প্রথা বেদেও ছিল না, মূল তন্ত্রেও ছিল না৷ বেদকে যারা কট্টোর ভাবে মানে সেই আর্য সমাজ মূর্ত্তিপূজার বিরোধী৷
ভারতে মূর্ত্তিপূজা শুরু হয় বৌদ্ধ যুগে৷ এদেশে বৌদ্ধধর্মের প্লাবন যখন আসে তখন দেশের অধিকাংশ মানুষই বেদের যাগযজ্ঞ প্রধান আর্য ধর্ম (ঋষিদের ধর্ম) বা তন্ত্রের দুরূহ সাধনা ছেড়ে দিয়েছিল৷ বৌদ্ধধর্মের সাধনা পদ্ধতিও চক্রের চক্রসাধনা থেকে গৃহিত৷ কিন্তু সাধারণ মানুষ তো অতসব করত না৷ তারা বুদ্ধের মূর্ত্তির সামনে প্রার্থনা করত৷ মহাযানী বৌদ্ধের যুগে বুদ্ধশক্তি রূপে নানান্ দেবদেবীরও মূর্ত্তি গড়া হতে থাকে৷ তারপর শংকরাচার্যের পর নবীন হিন্দু ধর্মের পুনরুভ্যুত্থান হলে ও সঙ্গে সঙ্গে পৌরাণিক যুগ শুরু হলে পুরাণ বর্ণিত বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্ত্তি গড়ে পূজা শুরু হয়ে যায়৷
কিন্তু তন্ত্রকে কী করে জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করা যায়! জনসাধারণ তো আর দুরূহ সাধনা করতে পারবে না! তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ (১৬–১৭ শতক) গভীর ভাবে এ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলেন৷ কথিত আছে, গভীর রাতে শ্মশানে শাক্তসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ধ্যানধারণায় রত৷ তখন ধ্যানযোগে জগন্মাতা ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্যে তাঁকে বললেন, ‘‘নিশাবসানে কাল সর্বপ্রথম যে নারী মূর্ত্তিটি যে রূপে যে ভঙ্গীতে তোমার নয়ন গোচর হবে, তাই হবে আমার সাধক ভক্তজনের হূদয় বিহারিণী মূর্ত্তি৷’’ পরদিন খুব ভোরে কৃষ্ণানন্দ গঙ্গাস্নানে চলেছেন৷ তাঁর চোখে পড়ল, রাস্তার পাশেই একটি কুটির৷ সেই কুটিরের দ্বারে শ্যামাঙ্গিনী এক গোপ–রমনী৷ তাঁর ডান পা কুটিরের অনুচ্চ বারান্দার ওপর স্থাপিত৷ আর বাম পা নীচে মাটিতে৷ ডান হাতে এক তাল গোময়৷ এমনি ভাবে তা উঁচু করে ধরা আছে যেন বরাভয় মুদ্রার প্রতিচ্ছবি৷ বাম হাত দিয়ে বেড়াতে মাটির প্রলেপ দিচ্ছেন৷ রমণীর কেশরাশি আলুলায়িত৷ হঠাৎ আচার্য কৃষ্ণানন্দকে দেখে লজ্জায় জিব কেটে সামান্য মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়েছেন৷
এই দৃশ্য দেখে কৃষ্ণানন্দের অন্তঃস্থলে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল৷ গত রাত্রির জগন্মাতার নির্দেশ তাঁর মনে ভেসে উঠল৷ তখন তিনি যে মুদ্রায় এই শ্যামাঙ্গিনী রমনীকে দেখলেন তারই সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তন্ত্রে বর্নিত দশমহাবিদ্যার প্রথম মহাবিদ্যা শ্যামা বা কালীর মূর্ত্তি তৈরী করলেন ও এই ভাবে তিনি শক্তিরূপিনী জগন্মাতার পূজা শুরু করলেন ও জনসাধারণের মধ্যে তার প্রচলন করলেন৷
বলা বাহুল্য, দশমহাবিদ্যার যে বর্ণনা তন্ত্রে রয়েছে, সদাশিব প্রবর্ত্তিত প্রাচীন তন্ত্রে নয়, পরবর্ত্তী কালে বিবর্ত্তিত তন্ত্রে, সেই মহাবিদ্যা ছিল আদ্যাশক্তি (আদি’র স্ত্রীলিঙ্গে আদ্যা) অর্থাৎ প্রকৃতির বিভিন্ন ভাবের কাব্যিক বর্ণনা৷ ওই দশমহাবিদ্যার মূর্ত্তি গড়া বা তাদের পূজা করার প্রথা ছিল না৷ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই প্রথম শ্যামাপূজার সূত্রপাত করলেন৷
পূর্বেই বলেছি, সাধকদের মনের বিভিন্ন ধরণের ভাব ঢস্তুন্দ্ব্ত্রগ্গ ও বিভিন্ন তত্ত্বকে পরবর্ত্তী কালে মূর্ত্তিরূপ দেওয়া হয়েছে৷ যেমন, ভারতবর্ষের ওপর মাতৃত্ববোধ আরোপের ভাবটিকে ‘ভারতমাতা’র মূর্ত্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়৷ তেমনি, কালীমূর্ত্তিও মূল প্রকৃতি বা আদ্যাশক্তির প্রতীকী রূপ৷
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উদ্ভূতি ব্রহ্ম থেকে৷ দার্শনিক বিশ্লেষণে বলা হয় ব্রহ্ম হলেন শিবূশক্তি৷ (শিব শক্ত্যাত্মকং ব্রহ্ম–আনন্দসূত্রম্ শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তি)৷ ‘পুরুষ’ মানে ‘পুরে শেতে যঃ সঃ’ অর্থাৎ সমস্ত সত্তার অভ্যন্তরে সাক্ষী সত্তারূপে যিনি বিদ্যমান৷ আর প্রকৃতি হ’ল ‘প্র করোতি যা সা’ অর্থাৎ প্রকার সর্জনী ক্ষমতা)৷ পুরুষ হচ্ছে বিশ্বের উপাদান কারণ–চৈতন্য সত্তা৷ আর প্রকৃতি হ’ল ক্রিয়াশক্তি৷ যেমন, একটা স্থূল উদাহরণ দিয়ে জিনিসটা বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে৷ একতাল মাটি থেকে নানান্ পুতুল গড়া হ’ল৷ এই মাটি হ’ল উপাদান কারণ৷ এই মাটি থেকে নানান্ পুতুল গড়ার জন্যে একটা ক্রিয়াশক্তি দরকার৷ বলা হচ্ছে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূল উপাদান কারণ হ’ল চৈতন্য সত্তা–পুরুষ৷ আর আপাতঃ নিমিত্ত কারণ বলতে পারি প্রকৃতি–একেই বলা হয় আদ্যাশক্তি৷ পুরুষ তথা চৈতন্যের ওপর শক্তির লীলানৃত্য চলছে৷ তারই প্রতীকী মূর্ত্তি হ’ল শিবের বক্ষে কালীমূর্ত্তি৷ কালীর রঙ কালো৷ কারণ, সৃষ্টির আদিতে তখন কোন বর্ণ সৃষ্টি হয়নি৷ কালো রঙ হ’ল সব বর্ণের অনুপস্থিতির দ্যোতক৷ আদ্যাশক্তি অসীম৷ তাই কোন বসন দিয়ে তাকে ঘেরা যাবে না–তাই তিনি বিবসনা৷ গলায় মুণ্ডমালা কেন তান্ত্রিক সাধকের গান আছে–
‘‘আদিভূতা সনাতনী শূন্যরূপা শশীভালী,
ব্রহ্মাণ্ড ছিল না যখন মুণ্ডমালা কোথায় পেলি’’
আদ্যাশক্তি কালী৷ বিশ্বজননী তিনি৷ বিশ্ব যখন সৃষ্টি হয় নি, তখন মানুষের মুণ্ড তিনি কোথায় পেলেন –আসলে ব্যাপারটা হ’ল, ওগুলো তো আসলে মুণ্ড নয়, এক একটা ভাব৷ কিসের ভাব বিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে সৃষ্টি হয় মূল ৫০টা ভাব তরঙ্গ৷ প্রশান্ত বিশুদ্ধ চৈতন্যের সমুদ্র বক্ষে প্রথম দেখা দিল তরঙ্গ৷ যেখানে তরঙ্গ সেখানে শব্দও আছে–যতই সূক্ষ্ম হোক না কেন৷ তাকেই বলে বীজমন্ত্র৷ এক একটি ভাব হ’ল এক একটি বীজমন্ত্র৷ একে বলা হয় মাতৃকা বর্ণ৷ এমনি ৫০টি–যা সংস্কৃত বর্ণমালার ৫০টি বর্ণ৷ এই বর্ণের শব্দ কিভাবে উচ্চারণ করি –মুখ দিয়ে৷ তাই এক একটা মুখ অর্থাৎ মুখ সমন্বিত মুণ্ড এক একটা বর্ণ বা ধ্বনির প্রতীক৷ এই ৫০টি বর্ণের মালাকে বলা হয় অক্ষ মালা৷ অর্থাৎ বর্ণমালার আদি বর্ণ–‘অ’ থেকে বর্ণমালার শেষ বর্ণ ‘ক্ষ’ (সংস্কৃত বর্ণমালায় ‘ক্ষ’ হ’ল সর্বশেষ মাতৃকা বর্ণ)৷
কালীর গলায় অক্ষ মালা৷ হ্যাঁ, আবার বলা হ’ল ‘অ’ সৃষ্টি বীজমন্ত্র তাই ‘অ’–এর দ্যোতক মুণ্ডটা কালী হাতে ধরে রেখেছেন৷ আর ৪৯টি গলায়৷ এই হ’ল মুণ্ডমালার ব্যঞ্জনা৷
এই হ’ল সৃষ্টিতত্ত্বের প্রতীকী রূপ৷ এটা একটা দার্শনিক তত্ত্ব৷ কিন্তু তন্ত্রের সাধনা বিজ্ঞানে কী বলা হচ্ছে বিশুদ্ধ চৈতন্যসত্তা–‘শিবে’র সঙ্গে জীব ভাবের মিলন মিটাতে হবে৷ আর তার জন্যে তন্ত্রে রয়েছে ষট্চক্র সাধনা, মনকে একাগ্র করে’–বিন্দুস্থ করে’ ‘পরম শিবে’ তথা ব্রহ্মে লীন করতে হবে৷ এরই নাম ব্রহ্মসদ্ভাব বা ব্রহ্মসাধনা৷ আর তার জন্যে জপ–ধ্যান ক্রিয়াও রয়েছে৷ তন্ত্রে বলা হয়েছে–
উত্তমো ব্রহ্ম সদ্ভাবো, মধ্যমা ধ্যান ধারণা৷
জপস্তুতি স্যাদধমা মূর্ত্তি পূজা ধমাধমা৷৷
–অর্থাৎ সর্বোত্তম হ’ল ব্রহ্মসদ্ভাব বা ব্রহ্মসাধনা৷ ব্রহ্মসদ্ভাব যার দ্বারা সম্ভব হচ্ছে না, সে ধ্যানধারণা করবে৷ এটা হ’ল মধ্যমপথ৷ ধ্যান–ধারণা যে করতে পারছে না, সে জপস্তুতি করুক৷ এটা হচ্ছে অধম পথ৷ আর তাও যে পারছে না তার জন্যে মূর্ত্তিপূজা৷
আর, হ্যাঁ, কালীপূজা করা হয় অমাবস্যায়৷ সেই সঙ্গে দীপাবলী উৎসবও হয়৷ কার্ত্তিকের এই অমাবস্যাকে বছরের সবচেয়ে বেশী–ঘোর অন্ধকার বলে’ বলা হয়৷ এই অন্ধকারকে সরিয়ে আলো জ্বালাতে হবে৷ দীপাবলী ও কালীপূজার ইঙ্গিত এইটাই৷ কেবল বাইরের অন্ধকার হটানোর কথা বলা হচ্ছে না, আমাদের মনের অন্ধকার হঠাতে হবে, অন্তরের চিতিশক্তির অর্থাৎ শুদ্ধ চৈতন্যশক্তির জাগরণ ঘটাতে হবে–আত্মশক্তির জাগরণ ঘটাতে হবে৷ এটাই তন্ত্র সাধনার মূলকথা৷
- Log in to post comments