মাত্র কয়েক হাত দূরত্বের মধ্যে এসে বসলেন তিনি৷ যোধপুর পার্কের বাড়িতে রিপোর্টিং রুম থেকে বেরিয়ে এক খাটের উপরে৷ সেই ভক্ত শিষ্য কুলের মধ্যমণি হয়ে৷ সভার ঔজ্জ্বল্য নিজের বিনীত প্রবেশে কোটিগুণ বাড়িয়ে নিয়ে, আমার ঠিক সামনে বসলেন৷ ওই কয়েক লহমায় আমার হৃৎস্পন্দন যে দ্বিগুণ হয়ে গেছে, দিব্যি টের পাচ্ছি সেটা৷ যাঁকে দেখার ও শোনার জন্য ছুটে এসেছি৷ কলকাতায় থাকার সুবাদে তাঁর কাছাকাছি থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ বয়স তখন কৈশোর ছাড়ায়নি৷ তিনি সদ্য ফিরেছেন ভারত পরিক্রমা শেষে৷ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে হোক বা কোনওরকমে দরজার ফাঁক দিয়ে অনুপ্রবেশ করে ফরাসে বসেই হোক, যাঁকে শুধু দেখতে পাবো বলে৷ শুনেছি অনেক কিছু৷ ভবিষ্যতে তাঁকে কাছে পাবার অভিজ্ঞতা আমাকে ভরিয়ে তুলেছে বারবার, সেই মানুষটি বসে আছেন, কয়েক হাতের দূরত্বে৷ আমি চাইলেই তাঁকে ছুঁতে পারি যেন, এরকম দূরত্বে৷ চাইলেই কি পারি সেটা?
শহরের এক বৈকালিক ধর্মসভায়৷ তার কিছু আগেই শ্রোতার আসন নিয়েছি আমি৷ নানা আক্ষেপের আলোচনায় বেড়ে উঠেছি চারপাশে বয়ে চলা দেশকে নিয়ে, দ্বেষকে নিয়ে৷ কিছুদিন পরেই জানতে পেরে যাবো তাঁকে ছাড়া উপশমের অন্য উপায় আমাদের আর জানা নেই বলেই, আমরা প্রবেশের অনুমতি পেয়ে ঢুকেছি সেখানে৷ ‘দু’দণ্ড শান্তি’র খোঁজে৷ পূর্ব পরিচিত জনৈক দাদা আমাকে কেন জানিনা একেবারে সামনের দিকে এনে ফেললেন৷ দৌড়ে পিছনের দিকেই যাচ্ছিলাম, তিনি দেখে ফেললেন এবং ডাকলেন যথারীতি৷ বসতে বললেন আমাকে, ঠিক ওঁর পিছনে আমার বসবার ব্যবস্থা হল৷ অনুভব একখানা করে মোচড় দিচ্ছে আর গুরু’ দর্শনের গর্বিত তৃপ্তি থেকে থেকে চুঁইয়ে নামছে তখন৷
অনন্ত অপেক্ষা র শেষ করে সেই নিরুচ্চার আলোকময় প্রবেশ ঘটালেন তিনি৷ চারিপাশে তাঁরই জয়ধবনি৷ তিনি এসে বসলেন৷ ডান থেকে বাম দিক দেখে নিলেন, নাকি অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে বুঝে নিলেন সকলের অন্তরের জিজ্ঞাসা৷ আমার ও ছিল কিছু আকুল জিজ্ঞাসা তার মধ্যে৷ ধরা ছোঁয়ার দূরত্বে বসে আমার গুরু৷ ওই যা হয়, নক্ষত্রকে হাতের আওতায় দেখতে পেলে তাঁকে ঘিরে যা যা স্মৃতি, সব উপচে উঠতে থাকে৷ আমারও হতে শুরু করল সেটাই এবং আমি নিশ্চিত, অনেকেরই তাই৷ আতবলা কোন স্তরে পৌঁছতে পারে, কী সৎসঙ্গে, কী এককে, এই আশ্চর্য উপস্থিতি আমাকে কমপক্ষে শতাধিক বার বুঝিয়ে দিয়েছে৷ তাঁকে কাছে পেতে পরে অনেকবার ছুটেছি৷ কিন্তু এই প্রথম দর্শন সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা৷ কথাটা মাথায় আসতেই আমি আর ততক্ষণে দেখাদেখির দোটানায় নেই, আজ যখন এত কাছে পেয়েছি, একবার পা স্পর্শ করে তবেই যাব৷
গান আর কীর্তন শেষ হতেই তিনি শুরু করলেন বলা৷ কিছু কি শুনছি ? হ্যাঁ শুনছি বটে কিছু কি বোধগম্য হচ্ছে ? মোটেই না৷ কেবল তাকিয়ে আছি, আর আছি মন ভরে প্রাণ ভরে শুধু চোখ দিয়ে শুষে নিচ্ছি তার উপস্থতি৷
কথা শেষে ছোটখাটো একটা ভিড় স্বভাবত জড়ো হল তাঁকে ঘিরে৷ ভক্তমনের আকুতি যেমন আছে আরও কিছুক্ষণ সামনে থাকার৷ তেমনই আছে তাঁর অজস্র কর্ম সম্পাদনের তাড়া৷ বহুপরিচিত অপরিচিত মুখের অনাড়ম্বর আন্তরিকতা তাঁকে ঘিরে রয়েছে৷ আমি তখন সামনের দিকে ঠেলে চলেছি, ‘চলো, আরে চলো...’ বলতে বলতে৷ মনে হচ্ছে সকলেই ঢিলে দিচ্ছে৷ এমন সময় কী মনে হতে তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং নির্ঘাত আমার চোখেমুখে ঝলমল করে ওঠা লোভটুকু পড়ে নিতে পারলেন সহজেই৷ ‘একবার কি প্রণাম করা যায় ওঁকে?’ লজ্জার মাথা খেয়ে জিগ্যেস করেই ফেললাম৷ উত্তর যে কি এলো শুনিনি৷ কিন্তু পৌছাতেও পারলাম না তার চরণ তলে৷ অভিমান, লজ্জা, ঘিরে ফেলেছিল৷
এইখানে বলি, প্রথম নমস্কার টা উনিই করতেন সেটা পরে জেনেছি৷ নমস্কার করার আগেই তাঁর করা নমস্কারই দেখেছি পরের দিনগুলোতে৷ আজীবন সেটাই তিনি করে চলেছেন, তার জন্য যতবারই নত হতে হোক না কেন৷ আসলে ওই প্রত্যেকবারের নমস্কার তার সৃষ্ট সৃষ্টিকেই৷
এইরকমটা যখন চলছে, তখন সমানে চলছে তার জয়ধবনি৷ এরপর গাড়িতে উঠতে হবে ওঁনাকে৷ গন্তব্য লেক গার্ডেন্সের নিবাস৷ তাই এক ধরনের তাড়া চলছে৷ আমি বুকের ধুকপুকুনিটা আরও একটু বাড়িয়ে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম, দেখতে পেলাম তিনি নমস্কার জানিয়ে গাড়িতে উঠলেন৷ জয়ধবনি চলছে চারিদিকে, আর আমার চোখে তখন ধারা৷ কন্ঠস্বর রুদ্ধ৷ বহুদিনের জমে থাকা আবেগ কান্না হয়ে বেরোবার চেষ্টা করছে৷ অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, এই ধরনের মুহূর্তগুলো, যাঁর জন্য আজীবনের তৃষ্ণা, সেটা ঘটে চলবার সময়ে এমন আবহাওয়া ঘিরে ধরে চারপাশ থেকে যে, ইন্দ্রিয়েরা ঠিকঠাক সাড়া দেয় না, সব কেমন যেন আবছা হয়ে আসে৷ এক্ষেত্রেও তাই ঘটল৷ বুঝতে পারছি আশপাশের প্রতিটি শব্দ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে গিয়ে আমার কান অব্দি আর এগোচ্ছে না, কেননা মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে৷ জীবনে অনেক কিছুর মাসুল দিয়েছি, আজও দিচ্ছি৷ তার বদলে জীবনই হয়তো মাঝেমধ্যে আমার মুঠোয় গুঁজে দিয়েছে অপ্রত্যাশিত এইসব পুরস্কার, যাঁর দিকে তাকানোর কথা ভাবলেও চোখ ঝলসে যায় আজও৷ এ তেমনই এক মুহূর্ত, এটুকু টের পাচ্ছিলাম৷ আর খেয়াল যখন হলো আমি তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে চলে যাওয়া রাস্তায়৷ আর টের পাচ্ছি, পেতেই হবে, পেতেই হবে ওই চরণ খানি৷ পরিচিত রা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে৷ আমি নিচু হলাম, তার চলে যাওয়া ভূমিতে স্পর্শ করার জন্য৷ মনে মনে শান্ত দুটি পায়ের পাতা স্পর্শ করলাম নিশ্চিন্তে৷ তখন আমার চারপাশ আমার কাছে অদৃশ্য, কেবল স্মৃতি ঘিরে রেখেছে আমাকে, ওঁর উপস্থিতির মুহুর্ত, অলীক স্মৃতি৷ সেসব স্মৃতির ভিড় ঠেলে, পায়ের স্পর্শ নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছি তখন আমি৷ কল্পনায় তখন তাঁর মুখাবয়ব৷ সম্ভবত আমার সম্মোহিত অপ্রস্তুতির বহর দেখেই আমার আচার্য দেব পিঠে হাত রেখে ভিতরে নিয়ে গিয়ে তার ঘরে বসালেন৷ আমার সামান্য মুঠোর আগলে তখন এই গ্রহের শ্রেষ্ঠ দু’খানা পায়ের পাতা, যাঁর কথা ভেবে এই এতগুলো দিন ধরে কেবল বিস্মিতই হয়ে এসেছি৷ জানি এ কথার কোনও অর্থ হয়ত অন্যদের কাছে হয় না৷ হালকা হয়ে এলাম উন্মত্ততার দিকে ছুটে চলা, নিজের শরীরে আর অহং-এর প্যাঁচখেলা দেখানো নির্লজ্জতা থেকে৷ হালকা হয়ে এলাম অন্ধতা’র অমানবিক আনন্দ আর নানা অভিজ্ঞতার অশ্রদ্ধায়, অগ্রাহ্যে, অনাদরে পুড়িয়ে ফেলবার আক্রোশ থেকে৷
বসলাম আর শুনতে পেলাম, আচার্যদেব আমাকে জিজ্ঞেস করছেন খেয়ে এসেছ৷
- Log in to post comments