Skip to header Skip to main navigation Skip to main content Skip to footer
CAPTCHA
This question is for testing whether or not you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

User account menu

  • My Contents
  • Log in
নোতুন পৃথিবী
সর্বাত্মক শোষণমুক্ত সমুন্নত সমাজ রচনার পথপ্রদর্শক

প্রধান মেনু

  • প্রথম পাতা
  • আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ
  • প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়
  • সংবাদ দর্পণ
  • দেশে দেশে আনন্দমার্গ
  • সম্পাদকীয়
  • প্রবন্ধ
  • খেলা
  • নারীর মর্যাদা
  • স্বাস্থ্য
  • প্রভাতী
  • ইতিকথা

দধীচি দিবসের শ্রদ্ধার্ঘ্য

জ্যোতিবিকাশ সিন্হা

তাহারা যুগে যুগে আসে

বিধাতার নির্দেশে

সত্য, ধর্ম প্রতিষ্ঠা লাগি

পরার্থে সর্বস্ব ত্যাগি’

মৃত্যুসাথে করে আলিঙ্গন৷

সশ্রদ্ধ চিত্তে তাহাদের করি’ স্মরণ

নিতে হবে সবে কঠিন শপথ

জগৎ কল্যাণে দধীচি-ব্রত৷

কালচক্র এগিয়ে চলেছে অনাদি থেকে অনন্তের পথে৷ এই অনন্ত চলার পথে সমাজে আসে বহুমাত্রিক পরিবর্তন৷ সময়ের ধারাপ্রবাহের স্বাভাবিক নিয়মেই সমাজজীবনে সুখ-দুঃখ, আলো-অন্ধকারের খেলা চলে৷ মানুষ সমাজবদ্ধ জীব৷ নিজের প্রয়োজনেই মানুষ সমাজ সৃষ্টি করেছে৷ মানব সমাজের কল্যাণে বিভিন্ন সময়ে বহুবিধ নিয়মনীতিরও প্রচলন হয়েছে৷ কিন্তু সমাজ জীবন বা মানব জীবন সরলরৈখিক গতিতে চলে না---জীবন প্রবাহে আসে উত্থান-পতনের তরঙ্গায়ন৷ এই কারণেই মাঝে মধ্যে নিয়ম-শৃঙ্খলার চরম বিচ্যুতিতে সমাজে দেখা দেয় ঘোর অন্ধকার৷ একশ্রেণীর মানুষের লোভ ও অন্যায়ের শিকার হয় সাধারণ নিরীহ ধর্মাশ্রয়ী মানুষজন৷ নিপীড়িত মানবতার আর্তনাদে দিগবিদিগ হয় ব্যাপ্ত৷ এই পরিস্থিতিতে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের মধ্যে অপরের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার মানসিকতা তীব্রভাবে জেগে ওঠে৷ এইসব পরোপকারী মানুষেরা নিঃস্বার্থভাবে জগৎকল্যাণে এগিয়ে আসেন৷ নিজেদের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে তারা অপরের মঙ্গল সাধনের ব্রত গ্রহণ করেন৷ তাদের এই কর্তব্য পালনের ও ধর্মযুদ্ধের পথে যদি মৃত্যুও আসে তারা তা অবলীলাক্রমে বরণ করে৷ এই মানসিকতাসম্পন্ন মানুষগণকে সংসৃকতে দধীচি বলা হয়৷ পুরাণে কথিত আছে ভয়ঙ্কর দুর্বৃত্ত বৃত্রাসুরের দাপটে যখন দেবতারা স্বর্গচ্যুত হয়ে ত্রাহি ত্রাহি আর্তনাদ করছেন তখন মহর্ষি দধীচি তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন৷  প্রজাপতি ব্রহ্মার পরামর্শে দেবতারা দধীচির দেহাংশ দ্বারা নির্মিত বজ্রস্ত্রের আঘাতে ভয়ংকর অসুরকে হত্যা করেন ও স্বর্গরাজ্য ফিরে পান৷ এটি একটি শিক্ষণীয় গল্প৷ দুষ্ট, অহংকারী, অধার্মিক, অত্যাচারীর হাত থেকে মানব সমাজকে পরিত্রাণ  করার জন্যে যুগে যুগে যে সকল ধার্মিক সত্যাশ্রয়ী, নীতিবাদী মানুষেরা সংগ্রামে অবতীর্ণ হন ও আত্মবলিদান দেন, তাদেরও দধীচি নামেই অভিহিত করা যায়৷ এইসব মহাত্মা দধীচিকুলের  ত্যাগ ও তিতিক্ষার পূতাগ্ণির স্নিগ্ধ আলোকে মানুষের মনে জগৎকল্যাণের ভাবনা জাগ্রত হয়ে সমাজের দীর্ঘস্থায়ী প্রভূত উপকার সাধিত হয়৷

আমাদের মাতৃভূমি ভারতবর্ষ সুদূর অতীত থেকেই আধ্যাত্মিকতার ঐতিহ্যমণ্ডিত, মৈত্রী ও সম্প্রীতির আদর্শে সমৃদ্ধ দেশ৷ এই দেশের সাধক, মণীষী, মুনী-ঋষিগণ মানুষকে প্রেম, প্রীতি ভালবাসা ও মিলনের শিক্ষাই দিয়ে এসেছেন বহুকাল ধরে৷ তাঁদের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, ত্যাগ-সেবা এই দেশকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে৷ এই জন্যে যুগে যুগে বহু মানুষের দল বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে এদেশে এসেছেন শান্তির ও ভালবাসার আকর্ষণে৷ তবে কালের বিবর্তনে সময়ের ব্যবধানে মানুষের জীবনে ও মনে  দেখা দিয়েছে পরিবর্তন৷ বিশ্বায়নের যুগে, গতিময়তার প্রাবল্যে, বিজ্ঞানের অবদানে সমগ্র পৃথিবী আজ মানুষের হাতের মুঠোয়৷ চতুদির্েক ছড়ানো-ছিটোনো সহজলভ্য বিলাস-ব্যসনের উপকরণ৷ চটকদারি ভোগ বিলাসের জীবন ও স্বাচ্ছন্দ্যের মোহময়ী আগ্রাসন মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে চলেছে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে---যেন হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে৷৷ অতীতের ঐতিহ্যকে ভুলে মানুষ ভোগের পিছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত, বিধবস্ত৷ একশ্রেণীর মানুষ ন্যায়নীতি বিসর্জন দিয়ে গড়ে তুলছে সম্পদের পাহাড়, বিশাল অট্টালিকা, ভোগ্যবস্তুর হাজারো আয়োজন৷ আর তাদের দুর্নীতি ও শোষণের শিকার হচ্ছে বৃহত্তর জনসমুদায়৷ কোটি কোটি মানুষ অন্ন-বস্ত্র-চিকিৎসা বাসস্থানের অভাবে অমানুষিক যন্ত্রণায় কালাতিপাত করতে বাধ্য হচ্ছে৷ অশিক্ষা-কুশিক্ষার প্রভাবে কুসংস্কার ও ভাবজড়তার অন্ধকূপে নিমজ্জিত হয়ে ধূর্ত, স্বার্থপর শোষকের হাতের পুতুলে পরিণত হচ্ছে৷ এইসব বঞ্চিত, শোষিত মানুষগুলো প্রতিনিয়ত পরিত্রাণের পথ খঁুজে চলেছে৷ একদিকে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সামান্য লাভের আশায় সমস্ত রকম সামগ্রীতে ভেজাল---আর অন্যদিকে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে জল, স্থল, অন্তরীক্ষে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ ছড়িয়ে এই সব দুষ্ট নরপিশাচের দল সমগ্র সমাজকে পঙ্কিলতার আবর্তে ডুবিয়ে ধবংসের পথে নিয়ে চলেছে৷ তাদের শোষণের যন্ত্রটাকে সচল রাখার জন্যে সাধারণ জনগণের মধ্যে জাত-পাত, বর্ণ-গোষ্ঠী, ধর্মমত-সম্প্রদায়গত ভেদাভেদের বিষবাষ্প নিক্ষেপ করে মানুষে মানুষে বিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলেছে৷ লোভী পুঁজিবাদী শোষকদের এই সর্বনাশা কর্মকাণ্ডে সহায়করূপে পেটুয়া সংবাদ মাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করছে৷ তারা সমাজের মধ্যে আরো বেশী বিভাজন, অহিষ্ণুতা, হিংসা, ভয় ছড়িয়ে দিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে৷ শুধু তাই নয়, তাদের এই অপকর্মের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন তাঁরা হয় দেশদ্রোহী নতুবা বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্ণিত হয়ে যাচ্ছেন ওই সব দুষ্ট ও ভণ্ডদের চক্রান্তে৷

বিংশ শতাব্দীতে একদিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির শোষণের ষ্টীমরোলার আর অন্যদিকে জড়বাদী কমিউনিজমের অমানবিকতা ও অসংবেদনশীলতার চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, মানুষ প্রায় জড়ের পর্যায়ে পর্যবসিত---সেই যুগ সন্ধিক্ষণে আবির্ভূত হলেন মহাসম্ভূতি তারকব্রহ্ম শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তিজী ওরফে শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার৷ হতাশা জর্জর মানুষের কল্যাণে প্রবর্তন করলেন ‘আনন্দমার্গ’ দর্শন৷  ভারতীয় সংসৃকতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তি যে আধ্যাত্মিকতা, যা ক্রমশ বিলীয়মান অবস্থায় এসে পৌঁছেছিল, আনন্দমার্গ দর্শনের সোণার কাঠির পরশে তার মধ্যে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার হ’ল৷ আনন্দমার্গের সাধনা পদ্ধতির মাধ্যমে নিপীড়িত, শোষিত মানুষের মধ্যে তিনি জাগিয়ে তুললেন আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ৷ আনন্দমার্গের সহজ, সরল, ও বিজ্ঞানসম্মত সাধনা পদ্ধতির আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে এলেন ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গ্রহণ করলেন আধ্যাত্মিক জীবন চর্যার নিগূঢ় পাঠ৷ পুঁজিবাদী ধনতন্ত্র ও জড়বাদী কমিউনিজমের শোষণ ও নিপীড়নের অভিশাপ থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে ১৯৫৯ সালে মহান দার্শনিক শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার প্রবর্তন করলেন সামাজিক-অর্থনৈতিক দর্শন---‘প্রাউট’ বা প্রগতিশীল উপযোগ তত্ত্ব৷

মানবজাতির ইতিহাস পর্র্যলোচনা করে দেখা যায় যে সর্বদাই মনুষ্যসমাজে  শুভ ও অশুভ উভয় প্রকার শক্তি ক্রিয়াশীল থাকে আর  এই বিপরীতধর্মী শক্তির মধ্যে চলে নিরন্তর সংগ্রাম৷ মানবজাতির এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় অধিকাংশ  সময় অশুভশক্তির প্রাবল্য পরিলক্ষিত হলেও শুভশক্তির প্রবাহ নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে গেছে অন্তঃসলিলারূপে ৷ তা না হলে মনুষ্যনামক প্রাণী অন্যান্য বৃহদাকার অগণিত প্রাণীকুলের মতো পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ণ হয়ে যেত৷ তাই যখনই অশুভ শক্তির চরম আঘাতে মানব সমাজের অস্তিত্ব ধবংসের মুখোমুখি হয়েছে তখনই কোন এক মহান পুরুষের আবির্র্ভব ঘটেছে৷ সেই মহাসম্ভূতির নেতৃত্বে সকল শুভ শক্তির সম্মিলিত প্রয়াসে চন্ডশক্তি তথা পাপ শক্তির বিনাশ ঘটেছে ও বিশ্বে সাত্ত্বিকী শান্তি  ফিরে এসেছে৷ এছাড়া মানুষ বিচারশীল, বিবেক প্রধান জীব হওয়ায় ব্যষ্টিগতক্ষেত্রেও প্রতিটি মানুষের মধ্যে প্রতিমূহূর্তে চলেছে শুভ-অশুভের লড়াই৷  মানব মনের এই শুভ ভাবনাগুলোর উন্মেষের জন্যে,  মানবসমাজের মঙ্গল সাধনে যখনই কোন ব্যষ্টি বা সংঘটন  উদ্যোগী হয়েছে তখনই পাপশক্তি ও পশুশক্তির আক্রমণ নেমে এসেছে তাঁদের ওপর নির্র্যতন, নিপীড়ন, কুৎসা, এমনকি মৃত্যুরূপেও৷ মানুষের ব্যষ্টিগত ক্ষেত্রে ও সমগ্র মানব সমাজের মঙ্গল সাধনে নিবেদিত অধ্যাত্মবাদী সংঘটন আনন্দমার্গের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি৷ ১৯৫৫ সালে আনন্দমার্গ প্রচারক সংঘের জন্ম লগ্ণ থেকেই সম্মুখীন হতে হয়েছে বহুবিধ সংঘাত ও প্রতিকুলতার৷ অর্থনৈতিক ও সামাজিক শোষণের ধবজাধারীরা এই সংঘটনে প্রচার,  প্রসার ও  সাধারণ মানুষজনের  অকুন্ঠ সমর্থনে  ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়ে ও আনন্দমার্গের সর্র্বত্মক বিরোধিতায় সর্বশক্তির প্রয়োগ করে৷  কিন্তু পাপশক্তির বাধাবিপত্তিকে অগ্রাহ্য করে সংঘের নিঃস্বার্থ ,সৎ, নীতিবাদী, একনিষ্ঠ, দৃঢ় সংকল্প কর্মীগণ মানবজাতির কল্যাণে সেবামূলক প্রকল্পগুলির রূপায়ণে আত্মনিয়োগ করেন৷

বিশ্বজুড়ে বহুমুখী সেবাকার্য পরিচালনার জন্যে সংঘটনের একটি কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বিশাল সেবাকেন্দ্র স্থাপন করার প্রয়োজন অনুভূত হয়৷ এই উদ্দেশ্যে পুরুলিয়া জেলার গড়জয়পুরের   রাজা রঘুনন্দন সিংদেও-এর পত্নী রাণী প্রফুল্লকুমারী দেবীর  দান হিসাবে বাগলতা মৌজার জমিটি এই মহৎ কাজের জন্যে সংঘকর্তৃপক্ষ  গ্রহণ করেন৷ ঘন জঙ্গল পরিবেষ্টিত পাথুরে টিলা ও ডুংরি সন্নিবিষ্ট অঞ্চল নির্বাচন ও সেখানে সংঘের প্রাণকেন্দ্র আনন্দনগর প্রতিষ্ঠার পিছনে কতকগুিিল বিশেষ কারণ ছিল৷

প্রথমত ঃ সাবেক মানভূম জেলার এই অঞ্চলটি বিশ্বের সর্বপ্রাচীন ভূমি রাঢ়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ৷ পরবর্তীকালে এখানে ডায়নোসরের  ফসিলও পাওয়া গেছে৷  এককালে সুবর্ণরেখা, কংসাবতী, দামোদর, ইত্যাদি নদী ও এদের শাখানদী - উপনদীর তীরে তীরে এই অঞ্চল ও সন্নিহিত চতুষ্পার্শ্বস্থ অঞ্চলে ব্যবসাবাণিজ্য কেন্দ্র ও  সংসৃকতির পীঠ গড়ে উঠেছিল৷  এই অঞ্চলের উন্নতি হলে  রাঢ়ের সমৃদ্ধ ও বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস  বর্তমান পৃথিবীর মানুষের সামনে উন্মোচিত হবে৷

দ্বিতীয়তঃ এই অঞ্চলের সুদীর্ঘ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রয়েছে৷ শৈব, বৌদ্ধ ও জৈন তন্ত্রের বহু নির্দশন এই অঞ্চলের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে৷ মার্গগুরু শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজী বলেছেন--- আনন্দনগর হচ্ছে সাধনার জন্যে পৃথিবীর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান৷ এখানে নদীর তীরে, কোন পাথরের উপর, পাহাড়ের উপর বসে সাধনা করলে  মুহূর্তেই মন একাগ্র হয়ে যাবে৷  এছাড়া এই অঞ্চল মহাসম্ভূতি সদাশিব ও শ্রীকৃষ্ণের চরণস্পর্শে ধন্য আর  তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন ‘‘আমি আনন্দনগরের আনন্দমূর্ত্তি’’৷ আনন্দনগর এলাকায় শতাধিক তন্ত্রপীঠ ও গুহা আবিষৃকত হয়েছে যেখানে বহু হাজার বছর ধরে বহু মুনি-ঋষি-সাধক তন্ত্র সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছেন৷   তিনি তাঁর ‘সভ্যতার আদিবিন্দু রাঢ়’ গ্রন্থে এও বলেছেন---

‘‘ মানব সভ্যতার আদিবিন্দু রাঢ়, মানব সংসৃকতির চক্রনাভি রাঢ় ৷ সেই রাঢ় আবার স্বীয় গৌরবে উদ্ভাসিত হোক৷  সেই রাঢ় আবার ফলে-ফুলে -সম্পদে, মানবিকতায়- আধ্যাত্মিকতায় উপচে পড়ুক৷ তার চলার পথের কুজ্ঝটিকার আবরণ সরে যাক, তার বিষাদ মলিন মুখে হাসির ঔজ্বল্য ফুটুক৷ ’’

তৃতীয়ত ঃ পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা হচ্ছে সবচেয়ে অনুন্নত জেলা আর পুরুলিয়ার ঝালদা ও  গড়জয়পুর ব্লক  সর্র্বপেক্ষা উপেক্ষিত৷  এই অঞ্চলের মানুষের কাছে  শিক্ষা-দীক্ষা-উন্নয়নের সুফল ছিল সুদূরপরাহত৷  তাই  আনন্দনগরে স্কুল, কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, ছাত্রাবাস, শিশুসদন, কৃষিগবেষণা কেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে উঠলে তার সুফল এইসব স্থানীয় মানুষজনের সেবায়  বিস্তৃত হবে ও তাঁদের শিক্ষা-সংসৃকতি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি বিধান  সম্ভব হবে৷

যাইহোক, রাণী প্রফুল্লকুমারী দেবীর মহৎ দানে এই ভূমিখন্ডটি আনন্দমার্গ সংঘটনের হাতে আসা মাত্রই সেবামূলক প্রকল্প রূপায়নের কাজ শুরু হয়ে গেল৷ সেবাব্রতী সন্ন্যাসীগণ, অন্যান্য সর্বক্ষণের কর্মীদল ও আনন্দমার্গের সাধারণ ভক্ত সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় কর্মযজ্ঞে সামিল হলেন৷ মানুষের দানে মানুষের কল্যাণে একে একে গড়ে উঠতে লাগল বিদ্যালয়, কলেজ, অনাথ-আশ্রম, ছাত্রাবাস, হাসপাতাল, কুষ্ঠাশ্রম, প্রেস ইত্যাদি৷ এই বিশাল কর্মকান্ডে স্থানীয় মানুষেরাও যোগদান করলেন , তাদের ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার আলো পেতে শুরু করল, হাসপাতালের মাধ্যমে  চিকিৎসার ব্যবস্থা হল, দুঃস্থ শিশুরা হোমে থেকে শিক্ষালাভের সুযোগ পেল৷ সংঘের কর্মীবর্গ দিনরাত পরিশ্রম করে জঙ্গল কেটে, পাথর ভেঙ্গে যাতায়াতের রাস্তাঘাট  তৈরী করতে লাগলেন৷  সামগ্রিকভাবে আনন্দনগর ও চারপাশের গ্রামগুলিতে  উন্নয়নের জোয়ার গ্রামবাসীদের কাছে আশীর্বাদ রূপে নেমে এল৷ স্থানীয় মানুষেরা মার্গের সেবাপ্রকল্পগুলির ব্যবস্থাপনায় উপকৃত হয়ে মার্গের ঘনিষ্ট হতে শুরু করলেন৷ এইসবের ফলে  গ্রামগুলির দাদনদার ধনী ব্যষ্টিদের স্বার্থে ঘা লাগল  কারণ  তাদের মৌরসীপাট্টা ক্রমশঃ কমে যাচ্ছিল৷  স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে জোট বেঁধে সংঘের কাজ কর্ম বন্ধ করার ফন্দি ফিকির খঁুজতে লাগল৷ সেই সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল যুক্তফ্রন্টের শাসনাধীন---কমিউনিষ্ট দল সিপি.এম-সি.পি.আই ছিল যার মুখ্য চালিকা শক্তি৷ জড়বাদী কমুনিষ্টরা শুরু থেকেই  অধ্যাত্মবাদী আনন্দমার্গের বিরোধিতায় ছিল এক পায়ে খাড়া৷  তাঁরা তাদের পছন্দমত কমিউনিষ্ট মতানুসারী অফিসারদের মাধ্যমে  আনন্দমার্গ সংঘটনের ব্যাপক ক্ষতিসাধনের অপচেষ্টা  সর্বদাই করে গেছে৷  গড়জয়পুরের বিডিও অশোক চক্রবর্তী ছিলেন কট্টর কমিউনিষ্ট সমর্থক ও আনন্দমার্গের প্রতি সম্পূর্ণ বিদ্বেষভাবাপন্ন৷ স্থানীয় ব্লকের উচ্চতম কর্র্ত হয়েও আনন্দনগরের এই বিশাল কর্মযজ্ঞে কোনরকম মাতববরী করার সুযোগ পাচ্ছিলেন না৷ বিভিন্ন প্রকল্পের কোন বোর্ড বা কমিটিতে তাঁর কোন স্থান হয় নি--- আনন্দমার্গ সংঘটনের এই ধৃষ্টতার যথাযোগ্য জবাব দেওয়ার জন্যে তিনিও কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন৷ সরকারী জিপে চড়ে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে পঞ্চায়েত প্রধান, সদস্য ও নেতা মাতববরদের সহায়তায় সরল গ্রাম্য মানুষজনকে ক্ষেপিয়ে তুলতে শুরু করলেন৷ বাছাই করা লোকেদের সরকারী প্রকল্প গুলির সুবিধা পাইয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে আনন্দমার্গের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিলেন ও সংঘের ওপর চরম আঘাত হানার  প্রস্তুতি চালাতে লাগলেন৷ এইভাবে আনন্দনগরে আক্রমণের  চক্রান্তের নিখঁুত পরিকল্পনা সেরে বিডিও অশোক চক্রবর্তী সব ঘুঁটি সাজিয়ে ফেললেন৷  শ্রী চক্রবর্তীর এই চক্রান্তের কথা সংঘ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় শুভানুধ্যায়ী মানুষজনের কাজ থেকে জানতে পেরে গড়জয়পুর ও ঝালদা থানার দারোগা, এস.ডি . ও, ডি .এস.পি ও পুরুলিয়ার ডেপুটি কমিশনারকে আক্রমণের আশঙ্কার বিষয়টি জানান ও যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলেন৷ ওই অফিসারেরা মুখে আশ্বাস দিলেও প্রকৃতপক্ষে কোনরকম সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন নি৷

অবশেষে সেই চরম মুহূর্তটি উপস্থিত হল৷ ১৯৬৭ সালের ৫ই মার্চ, রবিবার, চরম আঘাত নেবে এল আনন্দনগরের বুকে৷ লোকমুখে সংঘের কর্মীগণ জানতে পারেন, ৪ঠা মার্চ ১৯৬৭, সারারাত ধরে  বাছাই করা ঘাতক শয়তানদের একত্রিত করে বিনা পয়সায় মদ ও মাংসের ভোজ খাওয়ানো হয়৷ পরদিন সকাল ১০ টা নাগাদ বিডিওর জহ্লাদ বাহিনী আনন্দনগরের পশ্চিমদিকের বনের পথে ধামসা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতে বাজাতে টাঙ্গি, বল্লম, তীরধনুক, তলোয়ার ও আরও অনেক মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায়৷ নরপিশাচদের  এই সংঘটিত নৃশংস আক্রমণে প্রায় ২৫ জন সংঘকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হন ও  ৫ জন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী --- আচার্য অভেদানন্দ অবধূত, আচার্য সচ্চিদানন্দ অবধূত, শ্রী অবোধ কুমার, শ্রী প্রভাস কুমার ও শ্রী ভরত কুমার নিহত হন৷ ঘাতক বাহিনী আনন্দনগরকে ধবংসস্তূপে পরিণত করে সন্ন্যাসীদের হত্যা ও মারাত্মক জখম করে, তাঁদের আরব্ধ কাজ সুসম্পন্ন করে  ফিরে যাবার সময়ে পুলিশ নড়াচড়া শুরু করে ও লোকদেখানো এক রাউন্ড শূণ্যে গুলিও ছোড়ে৷ এরপর আরম্ভ হয় প্রশাসনের দিক থেকে ঘটনাটি চাপা দেওয়ার  ও  জনরোষের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে  দেখানোর৷ সরকারের সর্র্বেচ্চ মহল থেকেও  এই মামলাটিকে খারিজ করার অপচেষ্টা করা হয়৷ কিন্তু সংঘ কর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষজনের মিলিত প্রয়াসে কুচক্রী বিডিও অশোক চক্রবর্তীর ৩ বছর সশ্রম কারাদন্ড ও অন্যান্য ৮ জনের  যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়৷

 পাপ শক্তির আক্রমণে ১৯৬৭ সালের ৫ই মার্চ,  বসন্তকালীন পলাশের আগুন ঝরানো প্রাকৃতিক পরিবেশে  সত্য, ধর্ম, সেবা ও আদর্শে র জন্যে পঞ্চদধীচি আত্ম বলিদান দিলেন৷ একইভাবে আনন্দনগরের পঞ্চদধীচি ও পরবর্তীকালে আরও আনন্দমার্গের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে জীবন উৎসর্গকারী দধীচিগণের আত্মবলিদান ব্যর্থ হয়নি৷ মানবতার সেবায়  নিবেদিত আনন্দমার্গ পৃথিবীর ১৮২ টি দেশে প্রসারিত হয়ে জগৎ কল্যাণে বহুমুখী  কর্মধারার ব্যাপ্তি ঘটিয়ে চলেছে৷ লক্ষ লক্ষ মানুষ  আনন্দমার্গের প্রদর্শিত পথে সাধনা ও সেবার মাধ্যমে মানব জাতির কল্যাণে ব্রতী হয়েছেন৷ পাপশক্তির আঘাত, আক্রমণ, চক্রান্ত আনন্দমার্গের গতিকে রুদ্ধ করতে পারে নি৷ বরং সংঘটনের ওপর যত বড় আঘাত এসেছে, আনন্দমার্গের বিজয়রথ  ততই দ্রুততার সঙ্গে  তার লক্ষ্যের পানে এগিয়ে গিয়েছে৷ অগণিত ভক্তগণ,  মানবতার পূজারী, সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষেরা  অমর দধীচিগণের আত্মত্যাগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বসেবার মহান ব্রতে আত্মনিয়োগ করে চলেছেন৷  আর সেই নরকের কীট নরাধম দুর্বৃত্তের দল ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ণ হয়ে যেতে বসেছে৷  অপরপক্ষে পরার্থে জীবনদানকারী  দধীচি গণের মহৎ আদর্শের অনির্বাণ দীপশিখা যুগ যুগ ধরে  মানুষের অন্তরের অন্তঃস্থল আলোকধারায় উদ্ভাসিত করে নব্যমানবতার আদর্শে মানুষ-জীব-জড়-উদ্ভিদসহ সমগ্র সৃষ্ট জগতের সেবায় এগিয়ে চলতে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে ও ভবিষ্যতেও জোগাতে থাকবে৷  অন্তরের আলোয় দীপ্ত এই মানুষদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়  একদিন আনন্দমার্গ ও প্রাউট প্রতিষ্ঠিত হবেই আর  শোষণহীন সুন্দর মানব সমাজও গড়ে উঠবেই৷  এই মর্মে স্মরণ করি তারকব্রহ্ম  শ্রীশ্রী আনন্দমূর্ত্তিজীর শাশ্বত বাণী---

‘‘অন্ধকার যতই ঘন হোক না কেন, তারপর প্রভাত আসবেই৷ অন্ধকারের পিশাচ যতই অট্টহাসি হাসুক না কেন, সূর্র্যেদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই তার সবকিছু শূন্যে মিলিয়ে যাবেই যাবে৷ তেমনি মানুষজাতির দুঃখের রাত্রি যে রকমই হোক না কেন, তপস্যার সূর্র্যলোক তার সমস্ত  অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দেবেই দেবে৷ মানুষের জীবনে অরুণোদয় হবেই হবে৷’’

  • Log in to post comments

আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ

দগ্ধৰীজ
শ্রাবণী পূর্ণিমা
পরমপুরুষের বিশ্বরূপ
যজ্ঞ প্রসঙ্গে
ঈশ্বর–প্রণিধানের মানসাধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া
আরও

প্রাউট প্রবক্তার ভাষায়

বাঙলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন 
শোষণের বহুবিধ রূপ
মানবিক মৌলনীতি
পাপ, পুণ্য ও অপরাধ
প্রাউটের দৃষ্টিকোন থেকে : ত্রিপুরার উন্নয়ন
আরও

সম্পাদকীয়

পরিযায়ী শ্রমিক সমস্যা কেন্দ্রীত অর্থনীতির বিনাশই সমাধান
শ্রাবণী পূর্ণিমা
সরিবে দুর্নীতিরাজ
পেট্রল ও ডিজেলের ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধি!
সমাজ–সভ্যতা বাঁচাতে চাই আদর্শ শিক্ষা

প্রবন্ধ শিরোনাম

  • দিব্য অনুভূতি
  • আমার বাঙলা
  • গল্প হলেও সত্যি 
  • সমাজ-এর সৃষ্টিই সভ্যতার প্রথম বিকাশে তাই সমাজ রক্ষা করা মানবতাবাদী শাসকের কাজ
  • বিধবস্ত দার্জিলিং---প্রকৃতির প্রতিশোধ
  • একটি ঐতিহাসিক তথ্য
  • ফাঁসীর মঞ্চে গাইলেন যিনি জীবনের জয়গান
  • আমার সন্তান যেন থাকে  দুধে ভাতে

পুরানো মাসিক খবর

  • October 2017 (106)
  • September 2017 (136)
  • August 2017 (105)
  • July 2017 (111)
  • June 2017 (104)
Pagination
  • Previous page ‹‹
  • Page 12
  • Next page ››
আরও আগের খবর
Powered by Drupal

নোতুন পৃথিবী সোসাইটির পক্ষ থেকে আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত কর্তৃক প্রকাশিত।

সম্পাদকঃ - আচার্য মন্ত্রসিদ্ধানন্দ অবধূত

Copyright © 2026 NATUN PRITHIVII SOCIETY - All rights reserved